বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ ইস্যুতে টানাপড়েন চলছে সরকার ও ইশরাকের সমর্থকদের মধ্যে। ইশরাককে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে টানা ৩৫ দিন আন্দোলনের মুখে বন্ধ রয়েছে সংস্থাটির সব ধরনের কার্যক্রম। সংগত কারণে ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন নগরবাসীর ভোগান্তির শেষ নেই। চলছে বর্ষা মৌসুম। এতে নগরজুড়ে বেড়েছে মশার উপদ্রব। বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ-মে পর্যন্ত ডেঙ্গু বেড়েছে দ্বিগুণ। ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে নাজুক ঢাকা দক্ষিণের নগরবাসী। অথচ নগর ভবন তালা বন্ধ থাকায় মশার ওষুধ ছিটানোও বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় জলাবদ্ধতা তো রয়েছেই।
শুধু মশা নিধনই নয়, ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাবলিক টয়লেট রক্ষণাবেক্ষণ, পার্ক ও মাঠ উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, রাস্তা আলোকিত করাসহ ৩০টিরও বেশি জরুরি সেবা বন্ধ রয়েছে সংস্থাটির। নগরবাসীর প্রশ্ন, এ ভোগান্তির শেষ কোথায়?
চলতি বছরের ২৭ মার্চ একটি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ইশরাক হোসেনকে গত ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিটি নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করে। এরপর তাকে মেয়র ঘোষণা করে ২৭ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করে ইসি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার শপথ পাঠের উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ মে থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে টানা ৩৫ দিন ধরে আন্দোলন করছেন ইশরাক সমর্থকরা। এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে ‘ঢাকাবাসী’ ব্যানারে। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনেই নগর ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে নগর ভবনে সব ধরনের দাফতরিক কাজ বন্ধ রয়েছে। কর্মকর্তারা অফিস করতে পারছেন না। সংস্থাটির প্রায় সব ধরনের সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। ভাটা পড়েছে মশক নিধনসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতেও। বৃষ্টির এ মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হলেও পানি নিষ্কাশনের কাজে নামেনি কেউ। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চাপা পড়েছে আন্দোলনে। অন্যদিকে বৃষ্টির ফলে মশার উপদ্রব বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ দক্ষিণ সিটির নাগরিকদের জীবন। সিটি করপোরেশনের সেবার সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। গুরুত্বপূর্ণ সেবার তালিকায় রয়েছে সড়কের বৈদ্যুতিক বাতি, হাসপাতাল, রাস্তা-নর্দমা-ফুটপাথ উন্নয়ন ও সংস্কার, বাজার ব্যবস্থাপনা, জন্ম-মৃত্যু-তালাক নিবন্ধন, মশক নিধন, আবর্জনা পরিষ্কার, কবর বা সৎকার, ব্যায়ামাগার, কমিউনিটি সেন্টার, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, সড়কে পার্কিং, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা, গ্রন্থাগার, সংগীত ও স্কুল, বাস টার্মিনাল, পাবলিক টয়লেট, পার্ক এবং খেলার মাঠ ইত্যাদি। এগুলো সবই এখন বন্ধ রয়েছে।
এরই মধ্যে গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে নগর ভবন প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন ইশরাকের অনুসারী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির কর্মচারীরা। ওই দিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে ইশরাক হোসেন নগর ভবনে গিয়ে নিচ তলার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মিলনায়তনে প্রবেশ করে অনুসারী ও কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা মতবিনিময় সভা করেন। এ সভার ব্যানারে লেখা ছিল ‘পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিতকল্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা। প্রধান অতিথি ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। মেয়র, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।’ এ সভায় সিটি করপোরেশনের প্রায় ৭০ জন পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক অংশ নেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিএনপি সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক কয়েকজন কাউন্সিলর। তবে শপথ না নিয়ে ইশরাক হোসেন কীভাবে নগর ভবনে সভা করতে পারলেন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশনা দিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
‘মেয়র’ লেখা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, ‘কেবল নগর ভবন নয়, যেকোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে আয়োজকরা ব্যানারে আমার নামের আগে মেয়র লেখেন। বিষয়টি আমার নিজের নয়, জনগণের দাবি।’ এ ছাড়া মঙ্গলবার ৭০টি ওয়ার্ডের সচিবদের নিয়ে বৈঠক করেন ইশরাক হোসেন। বৈঠক শেষে নগর ভবনে এসে ইশরাক হোসেন বলেন, অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য গণমাধ্যমে উপস্থাপনের জন্য স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা পদে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বহাল থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। এ জন্য তার পদত্যাগ দাবি করেছি।
আজ বুধবার মশক নিধন সুপারভাইজারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ইশরাক হোসেন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শপথ ছাড়াই যেভাবে ইশরাক হোসেন মেয়রের দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন, তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং আইনের সুসস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঘিরে ইশরাক হোসেনের বিষয়টা আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, আদালত যেহেতু ইশরাকের পক্ষে রায় দিয়েছিল, আর তখন সিটি করপোরেশনের মেয়াদ এক-দেড় মাস বাকি ছিল, ওই সময় কেন তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি তা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে শপথ না নিয়ে তিনি নিজেকে মেয়র ঘোষণা করা বা মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এখন যা ঘটছে তা খারাপ নজির স্থাপন করা হচ্ছে। বিএনপি ও সরকারের দিক থেকে এ বিষয়টি শক্তভাবে দেখা উচিত।
এদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দারা বলেছেন, নগর ভবনকেন্দ্রিক সেবা বন্ধ থাকলেও মশক নিধনের জন্য ওষুধ ছিটানোসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন চালু রাখা জরুরি। তবে এর বাইরেও যেসব সেবা রয়েছে, সেগুলো চালু না হলে নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়বে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌশুম শুরু হওয়ায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। একই সঙ্গে অল্প বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা জমে পড়ে আছে। দেখার কেউ নেই। আমরা যতটুকু জানি, ইশরাক হোসেনের মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ ইস্যুতে নগর ভবনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারও নাকি তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এসব কিছু থেকে নগরবাসী দ্রুত মুক্তি পেতে চায়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে শপথ না পড়ালে এ অচলাবস্থা কাটবে না। এ ব্যাপারে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ কর্মচারী এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত এক সভায় দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলম বলেন, বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের নগর ভবনে ঢুকে ‘মাননীয় মেয়র’ পরিচয়ে সভা করা নতুন ফ্যাসিজম তৈরির স্পষ্ট আলামত।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। বিএনপির ইশরাক হোসেনকে পৌনে ২ লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে মেয়র হন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস। গেল ২৭ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২০ সালের নির্বাচনে ফজলে নূর তাপসকে বিজয়ী ঘোষণার ফল বাতিল করে বিএনপি নেতা ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করেন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল। এরপর ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে ২৭ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন ইশরাককে মেয়র পদে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করলেও তাকে শপথ পড়ানো হয়নি। পরে তাকে মেয়র পদে শপথ না পড়ানোর জন্য উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের রায় ও গেজেটের কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা লিভ টু আপিল গত ২৯ মে পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেন আপিল বিভাগ।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে গত ৪ জুন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ইশরাককে ডিএসসিসির মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাজ শেষ করেছে। আপিল বিভাগ ইসির গেজেট বাতিল করেনি।
সময়ের আলো/এমএইচ