প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:০০ এএম
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, যাকে ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। গৃহবধূ থেকে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ হওয়ার পেছনের পথটা অতটা মসৃণ ছিল না। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না। সময়ের পরিক্রমায় সেই একজন গৃহবধু থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হয়েছেন তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ঘরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাকে এই দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জীবনে স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে তার গড়া দলের হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে তাকে। সেখান থেকে শুরু হয় তার রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন। টানা আট বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যখন তিনি এই আন্দোলনের পথে হাঁটতে শুরু করেন তখন শুরুতে কেউ পাশে না থাকলেও একসময়ে তিনি পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কখনো আপস করেননি বলে তাকে আপসহীন নেত্রী উপাধি দেওয়া হয় তখন।
জন্ম : খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলায় তার ডাক নাম ছিল পুতুল। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উন্নতিকল্পে তিনি দিনাজপুরে এসেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হলে তিনি দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তার সঙ্গে তৈয়বার বিয়ে হয়। তৈয়বা বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীর বাসিন্দা। এই পরিবার ‘টি-ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত। তার মা তৈয়বা মজুমদার সমাজকর্মী ছিলেন।
বিয়ে ও পারিবারিক জীবন : তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দিনাজপুরে কর্মরত থাকাকালে খালেদা খানমকে বিয়ে করেন। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট শুক্রবার দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদার পিত্রালয়ে বিয়ের আয়োজন করা হয়। খালেদা জিয়ার শ্বশুর বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি, কারণ তিনি করাচিতে ছিলেন। বিয়ের বছর খানেক আগে জিয়ার মা মারা যাওয়ায় তিনি শাশুড়ির স্নেহ থেকেও বঞ্চিত হন। খালেদার মা ছিলেন জিয়ার মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চৌকস সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সাধারণ বাংলাদেশি গৃহবধূর মতো পরিমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে লালন-পালন করতেই বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন। এমনকি যখন তার স্বামী ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখনও খালেদা জিয়া নিজেকে রাজনীতিতে বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সম্পৃক্ত করেননি, যদিও ফার্স্ট লেডি হিসেবে প্রটোকল অনুযায়ী তাকে আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার দুই ছেলে থাকলেও কোনো মেয়ে নেই। তার অন্যান্য বোনেরও কোনো মেয়ে নেই। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। দুই ছেলেরই মেয়ে আছে। তারেক রহমানের একটি মেয়ে আছে। তার মেয়েটি এখন যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কোকোর লন্ডননিবাসী দুই মেয়ে আছে এবং তারাও সেখানে লেখাপড়া নিয়ে আছেন।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো : আত্মগোপন, গ্রেফতার : মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর আত্মগোপনে থাকেন তিনি। ১৬ মে ঢাকায় ফিরেন। এরপর বড় বোনের বাসা, সেখান থেকে সিদ্ধেশ্বরীতে গিয়ে থাকেন। ২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা তাকে এবং দুই ছেলেকে আটক করে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি জীবনযাপন করেন।
রাজনীতিতে পথচলা : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন। খালেদা জিয়া ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর থেকেই জাতির সেবায় আত্মনিবেদন করেছেন। তিনি এমন একটি সময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। তিনি প্রথমে রাজনৈতিক ও পরবর্তীকালে সরকারি গুরুদায়িত্ব সময়োচিতভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা ছিল সংকটপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। এমন একসময়ে খালেদা জিয়া দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, যখন দেশ এরশাদের চাপানো সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উৎখাত করেন এবং সামরিক আইন জারি করেন এইচ এম এরশাদ। এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে ঘোষণা করে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। এরশাদের আগ্রাসী অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত দলটি যেন উত্তাল সাগরে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ার পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছিল এবং নতুন বাস্তবতার পটভূমিতে দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের কোনো যোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি ছাড়া দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একান্তভাবেই দুঃসাধ্য হয়ে গিয়েছিল। সদস্যপদ ও সমর্থকদের সংখ্যা বিবেচনায় ১৯৮১ সালের মধ্যে বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। সদস্যদের মধ্যে বহুমুখী মতাদর্শের কারণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মূলনীতির চেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের এমন একজন নেতা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, যিনি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে স্বকীয় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন। এদিকে বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ সাত্তার ধকল কাটিয়ে উঠে দলকে কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুনভাবে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো একজনকে নেতা হিসেবে খুঁজছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।
জিয়াউর রহমানের অনুসারী ও কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়ার পরিচিতি খুব কম থাকলেও দলের নেতৃস্থানীয় সবার কাছে তিনি সুবিদিত ছিলেন এবং তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তিনিই হতে পারেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কান্ডারি। বছরের পর বছর ধরে এই মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং তার নেতৃত্বে দলটি ভেতরের ও বাইরের সব বাধা-বিপত্তি ও ঘাত-প্রতিঘাত উতরে টিকে আছে। অনেক হিসাব-নিকাশ কষার পর খালেদা জিয়াকে শেষমেশ চূড়ান্তভাবে পছন্দ করা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থ্যানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি দলের পরিত্রাতা হিসেবে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগদান করেন এবং নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন।
এরাশাদবিরোধী আন্দোলন : খালেদা জিয়া মূলত ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে সাতদলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলন-কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ছেদ পড়ে। নির্বাচন প্রশ্নের বিরোধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দলে ভাগ হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৮ দল ও জামায়াত ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যায়। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, বাম দলগুলোর পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট থাকে রাজপথে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এরশাদ। আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে বের হয়ে এলে পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। রাজপথে দীর্ঘ ৮ বছর একটানা আপসহীন সংগ্রামে ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দেশবাসীর কাছে পেয়ে যান ‘আপসহীন নেত্রীর’ খেতাব।
খালেদা জিয়ার সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক ও গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ, পরবর্তী সময় জেল-জুলুম-নিগ্রহ, শেষ সময়ে অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সম্মান- সব মিলিয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যা তাকে ‘ঐক্যের প্রতীক’ করে তুলেছিল। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র বিনির্মাণ, জনপ্রত্যাশা পূরণ, প্রশাসনে সফল নেতৃত্ব, দুর্যোগ-দুর্বিপাক, বৈদেশিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া ছিলেন একজন পরিস্থিতিবোদ্ধা নেতা। তিনি প্রয়োজন হলে নিজের ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন। এ বিষয়ে লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ ‘খালেদা’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাস্তবিক অর্থে তিনি ছিলেন একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তার এই কৃতিত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।’
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। তিনি জীবনে প্রথম নির্বাচনে অংশ নেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, জনগণরে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতায় পরিণত হবেন- এটি তার বিরুদ্ধাচারীদের কাছেও অচিন্তনীয় ছিল। তাই ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে তারা যারপরনাই হতভম্ব হয়েছিলেন। তিনি যে কেবল আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা নয়, অভূতপূর্ব জনসমর্থন পাঁচটি আসনে তার বিজয়ও নিশ্চিত করেন। তারপর থেকে বিরুদ্ধাচারীদের শত ঘৃণ্য, কৌশল সত্ত্বেও তিনি কোনো নির্বাচনে হেরে যাননি। যদি নির্বাচন জনপ্রিয়তার মান নির্ধারণ করে, তা হলে তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন: কখনোই নির্বাচনে হেরে যাননি। বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে তার সমমর্যাদার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি।
নব্বইয়ের নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধু তৈরি পোশাক শিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাক শিল্প খাতে যোগ দেন।
খালেদা জিয়া জাতিসংঘে গঙ্গার পানি বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন, যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করে।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং পদত্যাগ করেন। ওই বছরের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১৬টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী হন। আর আওয়ামী লীগ ১৪৭ আসন পেয়ে জাতীয় পার্টি ও জাসদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন।
আন্দোলন-সংগ্রাম ও কারাবাস : অষ্টম সংসদের মেয়াদপূর্তির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ‘এক-এগারো’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে; তিনি ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েন। এ সময় তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু জুলুম-নির্যাতনের মুখেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। ২০০৭ সালে ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়। এক বছর কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন। এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেফতার হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের পরের বছর জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে একটানা ৯৩ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ে ছিলেন। পরের বছরেও তাকে একইভাবে ঘেরাওয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছিল।
৩৫ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সোচ্চার ও সংগ্রামমুখর ছিলেন। তার প্রতিশ্রুতির জন্য তাকে ভুগতে হয়েছে। তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তার সভা ও মোটর শোভাযাত্রা বিরোধীদের ভয়ংকর আক্রমণের শিকার হয়েছিল। তাকে নিঃসঙ্গ ও গণযোগাযোগহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যে ক্ষেত্রে কোনো মানসিক প্রশান্তি ছিল না।
ভোটের মাঠে অপরাজিত : তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সম্ভবত বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৩ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং কোনোটিতেই পরাজিত হননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এসব আসন হচ্ছে ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭। কিন্তু দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন তিনি। খালেদা জিয়ার অতীত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা দেখা যায়, তিনি বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং চট্টগ্রামের আসন থেকে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯১ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে এবং ২০০১ সালে খুলনার একটি আসন থেকে ভোটে লড়েছেন তিনি। নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুধু জয়লাভ করাই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার ভোটের ব্যবধানও ছিল বেশি।
সময়ের আলো/এনএ