বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর দলের অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ কমেছে। কয়েক দিন আগেও যারা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ইচ্ছাপোষণ করেছিলেন, এমনকি মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন; তাদের বেশিরভাগই এখন অনেকটা নীরব। তারেক রহমান ইতিমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বশীল নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কিংবা দল সমর্থিত শরিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট করলে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির কথা মাথায় রেখে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বেশিরভাগই তাই মাঠ থেকে সরে আসছেন। গত দুদিনে কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। অবশ্য কেউ কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচনের ব্যাপারে এখনও অনড়।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে ফেরার আগেই তারেক রহমান নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয় গুছিয়ে এনেছেন। সংসদ নির্বাচনের প্রচার-কৌশল নির্ধারণে সারা দেশের বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের নিয়ে সাত দিনের তথ্য-প্রচার কর্মসূচি শেষ করেছে বিএনপি। এর বাইরে তিন দফায় দেশের ২৭৬ আসনে মনোনীত প্রার্থীদের কর্মশালাও শেষ করেছে দলটি। যেখানে তারেক রহমান দলের সিদ্ধান্তকে অমান্য না করার নির্দেশ দেন। বৈঠকগুলোতে তারেক রহমান বলেন, আমি ধানের শীষ প্রতীকে মনোনীত প্রত্যেককেই সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাই। এ জন্য আমি ফুলের মালা নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। ধানের শীষের সবাইকে বিজয়ী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি এ-ও বলেন, জনগণের দুর্বল রায় নিয়ে সরকার গঠন হলে অনেকগুলো কাজ করা সম্ভব নাও হতে পারে। আমরা যেসব পরিকল্পনা করেছি এগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য অবশ্যই জনসমর্থন প্রয়োজন এবং এই কাজগুলো করার জন্য আগামী সরকারকে সেভাবে শক্তিশালী ম্যান্ডেটের ওপরে দাঁড়াতে হবে। যদি ম্যান্ডেট দুর্বল হয়, তা হলে হয়তো অনেকগুলো কাজ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য তিনি দলের সবাইকে ভোটে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। পরে হাইকমান্ডের এই বার্তা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংগঠনিক নেতাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
মনোনয়ন চেয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন তুর্কি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পাননি। সেখানে বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিমকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। যদিও তিনি নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদানের পর ধানের শীষের টিকেট নিশ্চিত করেন। শাহাবুদ্দিন তুর্কি সময়ের আলোকে বলেন, মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান মনোনয়ন বঞ্চিতদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে। সবাইকে সামনে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন। এর কোনো ব্যত্যয় হলে সাংগঠনিক কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ ধানের শীষের বাইরে কাজ করলে তাকে নিজ দায়িত্বে করতে হবে। দল তার দায়িত্ব নেবে না, এটাই পরিষ্কার বার্তা। জোটের প্রার্থীদেরও ভোটের মাঠে সর্বোচ্চ সহায়তা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেননা বিএনপি সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করতে চায়।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির ফারজানা শারমিন পুতুলকে প্রার্থী ঘোষণার পরপরই নির্বাচনের ঘোষণা দেন দলের কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। এলাকায় নিজে পাল্টা সমাবেশও করেন। গত ২৩ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র নেন তাইফুল ইসলাম। তিনি নিজের নির্বাচনী ইশতেহার ছাপিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারে অংশ নিচ্ছিলেন। হঠাৎ গত শুক্রবার রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়। মনোনয়ন বঞ্চিত তাইফুলের বাড়িতে যান ফারজানা শারমিন পুতুল। এ সময় তিনি নিজের জন্য ভোট চান। সাক্ষাতের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ছবির নিচে মন্তব্যে অনেকেই দুজনকে শুভেচ্ছা জানান। কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। ছবিতে দেখা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী ফারজানার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছেন। এ সময় তাইফুলকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে।
এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের আরেক শরিক গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে পটুয়াখালী-৩ আসন ছাড় দিয়েছে বিএনপি। ছাড় দেওয়া এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন বঞ্চিত হন। তবে জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত মামুন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না। তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নির্বাচন থেকে বিরত থাকবেন।
নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব) আসনে এবারও মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা বলে পরিচিত আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে ধানের শীষের টিকেট পেয়েছেন সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। শুক্রবার মনোনয়ন বঞ্চিত জুয়েলকে মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দেখা গেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। এ ছাড়া একই স্থানে ঢাকা ১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবদলের সামনের সারির সাবেক নেতা মামুন হাসানের সঙ্গেও করমর্দন করে কথা বলতে দেখা গেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। মাঠ পর্যায়ের এই নেতা পরে এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান; যাকে সমঝোতার আভাস হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিএনপি প্রথম দফায় (৩ নভেম্বর) প্রার্থী ঘোষণার সময় মাদারীপুর-১ আসনে দলের শিবচর উপজেলা শাখার সদস্য কামাল জামান মোল্লাকে মনোনীত করে। ওই দিনই জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকীর সমর্থকরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করেন। এর এক দিন পরই আসনটিতে মনোনয়ন স্থগিত করে বিএনপি। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কামাল জামানের অনুসারী নেতাকর্মীরা সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন। পরে দ্বিতীয় দফায় (৪ ডিসেম্বর) বিএনপি আরও ৩৬টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণার সময় মাদারীপুর-১ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য ও শিবচর উপজেলার যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়।
সম্প্রতি ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে উপজেলা বিএনপির একটি পক্ষ। পরদিনই তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষের টিকেট নিশ্চিত করেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি অনুরোধ করব, ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিএনপির সব নেতাকর্মীকে রাশেদ খানের সঙ্গে কাজ করতে এবং তাকে বিজয়ী করতে সর্বশক্তি দেওয়ার জন্য।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর) আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খান চুন্নু নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোষণা দিয়েও সরে গেছেন।
দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসন থেকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এরইমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। এ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা ছয়বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিবারই বিজয়ী হয়েছেন। বিএনপি এই আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে। জুনায়েদ দলীয় প্রতীক ‘খেজুরগাছ’ নিয়ে নির্বাচন করবেন। জানা গেছে, রুমিন মনোনয়নপত্র জমা দিলেও এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সরে আসতে পারেন বলেও কানাঘুষা চলছে।
তবে সব বিদ্রোহীই যে সরে দাঁড়াবেন, তেমনটা নাও হতে পারে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. লেয়াকত আলী চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির সিদ্ধান্ত কুরআন-হাদিস নয় মন্তব্য করে লেয়াকত ভোট করার সিদ্ধান্তে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অনড় ছিলেন।
এদিকে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে জোটের প্রার্থী বাদ দিয়ে বিএনপির দলীয় প্রার্থীর দাবিতে ডোমার ও ডিমলা উপজেলা শহরে পৃথকভাবে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। শনিবার দুপুরে ডিমলা উপজেলা শহরের শঠিবাড়ী সড়কে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ডিমলা উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে ওই বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাগনে শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনকে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে বের হওয়া ওই মিছিলটি উপজেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে মিছিলটি শহরের স্মৃতি অম্লান চত্বরের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়। সে সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এই আসনে বিএনপি জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি নেতা তুহিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে ছেড়েছে বিএনপি। তবে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী শিল্পপতি মোহাম্মদ শাহ আলম স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪-এর সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।
এএডি/