কখনো হারেননি দুর্বিনীত খালেদা

এম মামুন হোসেন

প্রথম পাতা

ভোটে হারের গল্প খালেদা জিয়ার নির্বাচনি ইতিহাসে নেই। যদি নির্বাচন জনপ্রিয়তার মান নির্ধারণ করে, তা হলে তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে

2025-12-31T02:14:44+00:00
2025-12-31T02:14:44+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা
কখনো হারেননি দুর্বিনীত খালেদা
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:১৪ এএম 
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি
ভোটে হারের গল্প খালেদা জিয়ার নির্বাচনি ইতিহাসে নেই। যদি নির্বাচন জনপ্রিয়তার মান নির্ধারণ করে, তা হলে তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি যতটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তার সব কটিতে জয়ী হন। বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে তার সমমর্যাদার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিনটি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তার মৃত্যুতে তিনটি আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করতে হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। নির্বাচনি নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ তিনটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করতে পারেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এই তিন আসনে বিএনপির একজন করে বিকল্প প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়া মারা যান। 

জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি, এমন কোনো বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। 

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিনটি আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা হলেও তিনি বা কেউ এখনও বৈধ প্রার্থী হননি। কারও মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে টিকে যাওয়ার পর তিনি বৈধ প্রার্থী বিবেচিত হন। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তার মনোনয়ন স্থগিত থাকবে। 

কিন্তু তিনটি আসনে বিএনপির বিকল্প প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আইনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো আসনে কোনো দল একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে পারে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে শেষ পর্যন্ত (প্রতীক বরাদ্দের আগে) যার নামে দল থেকে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হয়, তিনিই দলীয় প্রার্থী হন। 

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বৈধভাবে মনোনীত ঘোষণার পর কোনো প্রার্থীর মৃত্যু হলে সেখানে আবার তফসিল ঘোষণা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সেটা করতে হবে না। 

সব মিলিয়ে এই তিন আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করার প্রয়োজন হবে না বলে মনে করছেন আবদুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তফসিলে পরিবর্তন আনার কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন নেই। 

১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিনিই একজন গৃহবধূ থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হয়েছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ঘরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাকে এই দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে তার গড়া দলের হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে তাকে। সেখান থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তিনি। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, খুলনাÑ যেখানেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি ৫টি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতে বিজয়ী হয়েছেন। 

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১ ও চট্টগ্রাম-৮- এই পাঁচ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পাঁচটি আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে বিশ্বের ইতিহাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো নারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তবে সেই নির্বাচনেও খালেদা জিয়াকে হারাতে পারেননি কেউ। পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতে বিজয়ী হন তিনি। আসনগুলো হলোÑ বগুড়া-৬, বগুড়-৭, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-১। 

পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর মাসে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনেও খালেদা জিয়া বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, খুলনা-২, ফেনী-১ ও লক্ষ্মীপুর-২- এই পাঁচ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। 

এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারে গিয়েছিল বিএনপি। সেই নির্বাচনে ফেনী-১ ও ২, বগুড়া-৭, সিরাজগঞ্জ-২ ও রাজশাহী-২ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন খালেদা জিয়া। তখন তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু একতরফা সেই নির্বাচন বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই সংসদেই অবশ্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়। শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। 

২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন একজনের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নির্ধারণ করায় খালেদা জিয়া বগুড়া-৬, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনটি আসনেই বিজয়ী হন তিনি। 

টানা আট বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যখন তিনি এই আন্দোলনের পথে হাঁটতে শুরু করেন তখন শুরুতে কেউ পাশে না থাকলেও একসময় তিনি পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কখনো আপস করেননি বলে তাকে আপসহীন নেত্রী উপাধি দেওয়া হয় তখন। দৃঢ় মনোবলের কারণে, দেশপ্রেমের কারণে ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে দেশের মানুষ তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   কখনো হারেননি  দুর্বিনীত  খালেদা 


Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: