প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:৫৫ এএম
প্রতীকী ছবিরাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে পালাবদলের খেলা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট রাজনৈতিক দল বড় দলে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি জোট গঠনে তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে একাধিক দল নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করার টিকেট পেয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি দলকে আসন ছাড় দিয়েছে বিএনপি, সেসব আসনে ধানের শীষের প্রার্থী দেবে না দলটি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট রাজনৈতিক দলের জোটে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি রাজনৈতিক দল। নতুন যুক্ত হওয়া দল দুটি হচ্ছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আবার বড় দলে যুক্ত হওয়া এবং যোগ দেওয়ায় অধিকাংশ ছোট দল থেকে নেতারা বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কয়েক দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি দল বিএনপি ও জামায়াত জোটে যোগ দেওয়া এবং দলে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর জোটভুক্ত হওয়া বা বড় দলের যোগ দেওয়ার ঘটনা এবারই নতুন নয়। এর আগেও একাধিক দলের নেতা বড় দলে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং জয়ী হয়েছে। আবার বড় দলের নেতৃত্বে একাধিক দল মিলে জোট গঠন করে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারও গঠন করার নজির রয়েছে আমাদের দেশে।
গত দুই দশকে রাজনৈতিক জোটপ্রধান রাজনৈতিক দলের জন্য অপরিহার্য উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশির দশকের গোড়ায় এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে তিনটি বড় জোটের সমন্বিত ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামীকে জোটে না নিলে বিএনপির পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব হতো না।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সহায়তা ছাড়া সরকার গঠন করতে পারেনি। এরপর ২০০১ সালে জোট রাজনীতির নতুন যুগ শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট বড় বিজয় পায় এবং জোট রাজনীতি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
প্রতিপক্ষের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ গঠন করে ১৪ দল এবং শেষে মহাজোট, যেখানে জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী লীগ বিরোধী জাসদের মতো দলও যুক্ত হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত জোট ভেঙে যাওয়ার পর জোট রাজনীতিতে আসে বড় রদবদল। বিএনপি ২০ দলীয় জোট ভেঙে নতুনভাবে ১২ দল, সমমনা জোট, গণতন্ত্র মঞ্চসহ একাধিক প্ল্যাটফর্মকে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালালেও জোটবদ্ধ নির্বাচন আর আগের মতো স্থায়ী কাঠামোতে রূপ নেয়নি।
তারা বলছেন, আমাদের দেশের রাজনীতি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সেই ধারাবাহিকতায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলো চায় যেকোনোভাবে ক্ষমতায় অংশীদার হতে। সেটি বড় দলের সঙ্গে জোট ভুক্ত হয়েই হোক বা বড় দলের যোগ দিয়ে সেই দলের প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েই হোক।
এবার বড় দলের সঙ্গে জোটভুক্ত হলেও নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই নিজ দলের জনসমর্থন কম থাকায় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেটি বিবেচনায় নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নিজ দল বিলুপ্ত করে বড় রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো দলের নেতা সেই দল ত্যাগ করে বড় দলে যোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য ভোটের প্রভাবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই জোট রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহি, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য পূরণের পথে নিয়ে যেতে পারে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক নিবন্ধিত দল জোট করলেও জোট মনোনীত প্রার্থী বড় দলের বা অন্য দলের প্রতীকে ভোট করতে পারবে না, নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে।
বিএনপিতে যোগদান : বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম নিজ দল বিলুপ্ত করে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। বিএনপি তাকে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। সেলিমের দল নিবন্ধিত না হওয়ায় ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হতে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
২২ ডিসেম্বর জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন সমমনা ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা জোটের মুখপাত্র ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। তাকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঢাকা-১৩ ও নড়াইল-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হবেন।
গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া।
এ ছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) থেকে বেরিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন দলটির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে কুমিল্লা-৭ আসন থেকে নির্বাচন করবেন।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন তিনি। ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারও তার দল বিলুপ্ত করে পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করবেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো সাংগঠনিকভাবে অতটা শক্তিশালী না হওয়ায় বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হলেও নিজ দলের প্রতীকে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেই শঙ্কা থেকেই অনেকে দল বিলুপ্ত করে এবং দল ছেড়ে বড় দলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বিএনপির মিত্রদের আসন ছাড় : এ ছাড়া বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া সমমনা দল ও জোটের আরও কয়েক নেতাকে আসন ছাড় দিয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপির মিত্র হিসেবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের আসনে প্রার্থী দেবে না বিএনপি। তারা নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচন করবেন। ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী হবেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ আসনে লড়বেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ আসনে প্রার্থী হবেন।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি লড়বেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে। আর যশোর-৫ আসন থেকে ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি রশিদ নির্বাচন করবেন।
এ ছাড়া জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ৪টি নির্বাচনি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। অর্থাৎ এসব আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীই হবেন বিএনপির প্রার্থী। সেগুলো হচ্ছে নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মো. মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী, সিলেট-৫ আসনে মাওলানা মো. উবায়দুল্লাহ ফারুক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। এ ছাড়া একাধিক দল বিএনপিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট : এদিকে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া এনসিপি ও বিএনপির দীর্ঘদিনের জোট সঙ্গী এলডিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে নির্বাচনি সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে। বিএনপির কাছ থেকে কাক্সিক্ষত আসনে ছাড় না পাওয়ায় জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
অপরদিকে এনসিপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক দিন ধরেই বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন ও সমঝোতার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে এমন খবর আলোচনায় ছিল। সব শেষে দলটি জামায়াত জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি জামায়াতের কাছে ৩৫ আসন চেয়েছে। তাদের ৩০টি আসন দেওয়ার আলোচনা হলেও ২২ আসন এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়েছে। অপর ৮টি আসনে জোট সঙ্গী নেতারা নির্বাচন করায় তা আর হচ্ছে না। এ ছাড়া এসব আসনে প্রচারের জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে দেড় কোটি টাকা খরচ করা হবে বলেও জানা গেছে।
অপরদিকে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে চটেছেন এনসিপির অনেক আলোচিত নেতা। এদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। বেশ কয়েকজন পদত্যাগের পাইপলাইনেও রয়েছেন বলে অনেকেই মনে করছেন।
এদিকে আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান বলেছেন, জামায়াতের জন্য যারা এনসিপি ছাড়ছেন, তাদের জন্য আমজনতার দলের দরজা খোলা আছে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে, যুক্তি-তর্কের বিবাদ আছে, কোনো অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি আমাদের নেই। দরকার হলে জনতার কাছে ভিক্ষা চেয়েছি দলের জন্য, কারও গলায় পাড়া দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করিনি। নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করব। আপনারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আপনাদের জন্য এই ছাড় আমরা দেব।
এই জোটে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি রয়েছে। এই ১০টি দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে সব আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, রাজনীতিতে পালা বদল বা অন্য দল বা জোটে জোগ দেওয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে রয়েছে। অতীতেও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট গঠন ও দল বদল করতে দেখা গেছে। এবার আরপিও সংশোধন হওয়ায় অনেকে নিজ দল বিলুপ্ত করে বড় দলে যোগ দিয়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। দল বিলুপ্ত করে জোটের বড় দলের প্রতীক পেলেই বিজয় নিশ্চিত হবে; এটা কিন্তু বলা যাবে না।
সময়ের আলো/এআর