প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:০২ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলোবছরজুড়ে শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও আন্দোলন সামাল দিতেই ব্যস্ত ছিল দেশের শিক্ষা প্রশাসন। ফলে নীতিগত সংস্কার, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন কিংবা শিক্ষার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছাড়াই শেষ হচ্ছে বছর। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্দোলননির্ভর এ বাস্তবতায় শিক্ষা খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকরা এমপিওভুক্তি, বেতন স্কেল, পদোন্নতি, বদলি নীতিমালা সংস্কার ও বৈষম্য নিরসনের দাবিতে একাধিকবার রাজপথে নামেন।
এসব আন্দোলনের ফলে বারবার স্থগিত হয় ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো আন্দোলন মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষা খাতের জন্য সংকট, সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জে ভরা একটি বছর। দফায় দফায় অস্থিরতা এবং নীতিগত টানাপড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।
বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মবিরতি, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও নন-এমপিও শিক্ষকদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদোন্নতি-সংক্রান্ত আন্দোলন শিক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে। আন্দোলনের মুখে সরকার কিছু ক্ষেত্রে আশ্বাস ও আংশিক সিদ্ধান্ত দিলেও অধিকাংশ দাবি ঝুলেই রয়েছে।
এদিকে শিক্ষা খাতে বড় কোনো নীতিগত সংস্কার, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, আন্দোলন সামাল দেওয়ার কৌশলই যেখানে প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে গুণগত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। বছরের শুরুতে সময়মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা। প্রায় আড়াই মাস পর ধীরে ধীরে সেই সংকট কাটলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নিয়মিত পাঠদান প্রক্রিয়ায়।
এরপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। দীর্ঘ ১২ বছর পর অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণায় কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও প্রাথমিক স্তরের বৃত্তি পরীক্ষা আইনি জটিলতায় আটকে যায়।
বই বিতরণে বিলম্ব, ফল বিপর্যয়, ধারাবাহিক শিক্ষক আন্দোলন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা সবকিছু মিলিয়ে বছরজুড়ে শিক্ষা খাত চরম চাপের মুখে ছিল, যা এ খাতের ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলোকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক বছর তুলনামূলক ভালো ফলের পর এবার দুই স্তরের পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের ধস নামে।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এ বছর পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম এবং গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। ইংরেজি ও গণিতে ব্যাপক ফেল এসেছে। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশে, আর রাজশাহী বোর্ডে সর্বোচ্চ ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ হাজারের বেশি কম। ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৬৭ শতাংশ, আর ছেলেদের ৬৫ দশমিক ১১ শতাংশ।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলেও একই চিত্র দেখা যায়। ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অংশগ্রহণকারী ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২টি।
সময়ের আলো/এআর