বর্ষায় নৌকা মেরামতে ব্যস্ত কারিগররা

কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা

সারাদেশ

আর কিছুদিন পরেই আষাঢ় মাস শেষ হয়ে শ্রাবণ শুরু হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষা মানেই নতুন রূপে সজ্জিত প্রকৃতি আর নদ-নদীর

2025-06-24T05:30:33+00:00
2025-06-24T05:30:33+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বর্ষায় নৌকা মেরামতে ব্যস্ত কারিগররা
কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ জুন, ২০২৫, ৫:৩০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
আর কিছুদিন পরেই আষাঢ় মাস শেষ হয়ে শ্রাবণ শুরু হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষা মানেই নতুন রূপে সজ্জিত প্রকৃতি আর নদ-নদীর পূর্ণ যৌবন। আর এই বর্ষাকালে গ্রামীণ জনপদে বিশেষ করে উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনাবেষ্টিত চার উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর-দ্বীপচর এবং চরগ্রামগুলোতে নৌকাই হয়ে ওঠে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে এসব চর-দ্বীপচরের নদীজীবী মানুষের কাছে বর্ষা মানেই জীবন-জীবিকার নতুন সুযোগ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাতে এখন থেকেই গাইবান্ধার চরাঞ্চল এবং নদীপাড়ের মানুষ ব্যস্ত নৌকা মেরামতের কাজে। পুরোনো নৌকায় রঙের প্রলেপ দেওয়া থেকে শুরু করে নতুন নৌকা তৈরি- সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে প্রতিটি ঘাটে। বর্ষায় নৌকা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের তোড়জোড় শুরু হয়েছে জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে।

সদর উপজেলার কামারজানী নৌ-বন্দর, সুন্দরগঞ্জের হরিপুর, বেলকা ও কাপাসিয়া ঘাট, সাঘাটার মীরগঞ্জ, ঝাড়াকাটা ও গুয়াবাড়ি ঘাট এবং ফুলছড়ির তিস্তামুখঘাট ও বালাসী নৌবন্দর থেকে প্রতিদিন জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ ঘাট, কুড়িগ্রামের রাজিবপুর, সানন্দাবাড়ী, চিলমারি, রৌমারী, বগুড়ার সারিয়াকান্দিসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রী ও পণ্যবাহী অন্তত তিন শতাধিক যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করে। এর বাইরে চরাঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে আছে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা। তারা এসব নৌকায় ক্ষেতের পণ্য বাজারে নেন। আবার কেউ বর্ষাকালে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় নৌকা থেকে জাল ফেলে মাছ ধরেন। এক চর থেকে অন্য চরে চলাচল ছাড়াও খেয়া পারাপারের প্রধান বাহন এখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নদীই যাদের জীবন তাদের কাছে নৌকা কেবল একটি বাহন নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। মাছ ধরা থেকে শুরু করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত এমনকি পণ্য পরিবহনেও নৌকার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বর্ষার আগমনী বার্তা পেয়েই তারা পুরোদমে নেমে পড়েছেন তাদের প্রাণভোমরা নৌকাগুলোকে প্রস্তুত করার কাজে।

নদ-নদীর পাড়ের গ্রাম কিংবা চরগ্রামগুলোতে এখন যেন এক অন্যরকম ব্যস্ততা। পেশাদার কারিগর থেকে শুরু করে সাধারণ জেলেরাও নিজেদের নৌকাগুলোকে বর্ষার উপযোগী করে তুলতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কেউ পুরোনো নৌকার খোল মেরামত করছেন, কেউ আলকাতরার প্রলেপ দিচ্ছেন যাতে কাঠ সহজে পচে না যায়। আবার কেউবা কাঠ ও লোহার সরঞ্জাম নিয়ে নতুন করে মাস্তুল তৈরি করছেন কিংবা নতুন নৌকা তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। ঘরের নারী সদস্যরাও বসে নেই। তারাও হাত লাগিয়েছেন। কেউ পুরোনো জাল সেলাই করছেন, কেউবা নৌকার ভেতরের অংশ পরিষ্কার করছেন। এ বছর কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের দাম কিছুটা বাড়লেও জীবিকার তাগিদে মানুষজন এসবের তোয়াক্কা করছেন না।

ফুলছড়ি উপজেলার গুপ্তমনির চরে নৌকা মেরামতকারী শফিউল আলম বলেন, বর্ষায় আমাদের কাজ অনেক বেড়ে যায়। সারা বছর টুকটাক কাজ থাকলেও এ সময় সবাই নৌকা ঠিকঠাক করে। আমরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করি। কারণ নদীজীবী মানুষরা চায় তাদের নৌকাগুলো যেন ভরা বর্ষার আগেই ঠিকঠাক হয়ে যায়। কেউ মাছ ধরার জন্য, কেউবা শুধু যাতায়াতের জন্য নৌকা ব্যবহার করেন। তাই তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করতে হচ্ছে।

নদীপথে যাত্রী পারাপার ও পণ্য পরিবহন নৌকার মাঝিরা জানান, বর্ষাকালে নদীতে স্রোত বেশি থাকে। তাই নৌকা মজবুত হওয়াটা জরুরি। তা ছাড়া এ সময় নৌপথে যাত্রী পারাপার ও পণ্য পরিবহন বেড়ে যায়। তাই নৌকার ধারণক্ষমতাও ঠিক রাখতে হয়। নৌকার পাশাপাশি শ্যালো ইঞ্জিনসহ অন্যান্য সরঞ্জামও মেরামত করে নিচ্ছেন স্থানীয়রা।

সদর উপজেলার কামারজানীর জেলে উদয় দাস বলেন, বর্ষায় নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় মাছ বেশি পাওয়া যায়। তাই আমাদের নৌকাগুলোকে আগে থেকে ঠিক করে রাখতে হয়। ছোটখাটো মেরামতের কাজ নিজেরাই করি। কিন্তু বড় মেরামতের জন্য কারিগর ডাকতে হয়। এ সময় নৌকা মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম কিছুটা বেড়ে যায়। তবুও কাজ বন্ধ থাকে না।

বর্ষা যেমন নদ-নদী পাড়ের মানুষের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তেমনি বর্ষার প্রস্তুতি হিসেবে নৌকা মেরামত ও পরিচর্যার এই কর্মযজ্ঞও নদীজীবী মানুষের জীবনের আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঋতুতে নৌকার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বর্ষায় নৌকা মেরামতের এই তোড়জোড় গ্রামীণ অর্থনীতির এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এটি একদিকে যেমন তাদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় বন্ধনকেও তুলে ধরে।

সময়ের আলো/এমএইচ


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: