অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গুম হন আওয়ামী সংশ্লিষ্টরাও

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

প্রথম পাতা

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ অপরাধ কর্মকাণ্ড ছিল ভিন্নমতের লোকদের গুম করা। শুধু বিরোধী দলের

2025-06-27T03:59:30+00:00
2025-06-27T03:59:30+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গুম হন আওয়ামী সংশ্লিষ্টরাও
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০২৫, ৩:৫৯ এএম 
প্রতীকী ছবি
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ অপরাধ কর্মকাণ্ড ছিল ভিন্নমতের লোকদের গুম করা। শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাই নন, শাসক দল আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িত দলটির অনেক নেতাও গুমের শিকার হয়েছেন। দলীয় দ্বন্দ্ব কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তাদের গুম করা হয়। এখনও তাদের অনেকের খোঁজ মেলেনি।

‘গুম কমিশন’ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিগত এক দশকেরও বেশি সময়জুড়ে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনীতির আড়ালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, নির্যাতন ও বিচারহীনতার ভয়াবহ চিত্র। এই প্রতিবেদন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের দলিল নয়, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর চলমান হুমকির স্পষ্ট ভাষ্য।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ : আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিশন।

গুম কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার শাসনামলের এক দশকেরও বেশি সময়জুড়ে একটি সংগঠিত গুম প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল, যা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। তথাকথিত জঙ্গি দমনের ছদ্মাবরণে আওয়ামী লীগ একটি স্বৈরতান্ত্রিক চুক্তি করে ইসলামী উগ্রবাদের হুমকি ব্যবহার করে রাজনৈতিক মতামত কুক্ষিগত করে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে এবং তাদের শাসন দীর্ঘায়িত করে। এই প্রক্রিয়ায় তারা অপরাধ বিচারব্যবস্থাকে অস্ত্র বানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে এবং নির্যাতন ও গোপন বন্দিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

প্রতিবেদনে নারী বন্দিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, নিখোঁজ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের পর নারী বন্দিরা অভিযোগ করেছেন, তাদের ওড়না ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। পুরুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের দ্বারা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ক্রুসেডের মতো হাত দুই দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ওরা আমাদের ওড়না নিয়ে নেয়। আমাদের জানালার দিকে মুখ করে রাখা হতো। যাতে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুরুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দেখতে পায়। তারা আমাদের দেখে বলত, ‘এমন পর্দাই করেছ এখন সব পর্দা ছুটে গেছে।’ গুম কমিশনের কাছে এক নারী বলেন, তাদের নির্যাতনে আমার পিরিয়ড হয়ে যায়। তাদের কাছে যখন বলি, আমার প্যাড লাগবে তখন তা নিয়ে তারা হাসাহাসি করতে থাকে।

গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মিথ্যা মামলা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার মিথ্যা সন্ত্রাসবিরোধী মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি কীভাবে করা হবে। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি ভুক্তভোগীর গড় আইনি খরচ প্রায় ৭ লাখ টাকা, যা দেশের গড় বাৎসরিক পরিবারের আয়ের দ্বিগুণ। এ মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে, পুরো সম্প্রদায়কে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং ধীরে ধীরে আশাহীনতার মধ্যে ফেলে রাখে। অনেক ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানেই বিচারকের স্বেচ্ছাচারিতা নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই; বরং জবাবদিহি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সঠিকভাবে প্রয়োগে সহায়ক। আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দেশের আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাদের হেফাজতে ভুক্তভোগীদের ওপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন বা অপমানজনক ও অমানবিক আচরণ স্পষ্টতই অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং নিন্দনীয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আজকের বাংলাদেশে সত্য ও জবাবদিহির পথে একটি প্রধান বাধা হলো গুম-সংক্রান্ত বিষয়টিকে ঘিরে বিদ্যমান অস্বীকারের সংস্কৃতি। আওয়ামী লীগ বরাবরই সাংগঠনিকভাবে পরিচালিত গুম প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব অস্বীকার করে এসেছে। এমনকি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পরও আমরা এ অস্বীকারের সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে লড়াই করে যাচ্ছি, মূলত এ কারণে যে, অনেক অপরাধী এখনও ক্ষমতাসীন রয়েছেন। এর ফলে প্রমাণ ধ্বংস, প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতা, সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যখন ভুক্তভোগীরা সামনে এগিয়ে আসেন, তখন তাদের প্রকাশ্যে ও গোপনে হুমকি দেওয়া হয়। এ কমিশনের সদস্যরা যখন তাদের আইনানুগ দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাদেরও সময়ে সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে এ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রকাশ অনেক সময় পুনরায় ভুক্তভোগীদেরই আরও ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কীভাবে গুমের মতো ভয়ংকর পন্থা বেছে নিয়েছে সে প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার শাসনামলের এক দশকেরও বেশি সময়জুড়ে একটি সংগঠিত গুম প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল, যা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। তথাকথিত জঙ্গি দমনের ছদ্মাবরণে আওয়ামী লীগ একটি স্বৈরতান্ত্রিক চুক্তির মাধ্যমে ইসলামি উগ্রবাদের হুমকির অজুহাতে রাজনৈতিক মতামতের আশ্রয় নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় এবং তাদের শাসন দীর্ঘায়িত করে।

নির্যাতনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্রের মডেল অনুসরণ করেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্য গুরুত্ব দেয় সামাজিক সংহতি প্রতিরোধে, আর যুক্তরাষ্ট্র জোর দেয় শক্তি প্রদর্শনে। বাংলাদেশ গত এক দশকে বক্তৃতায় যুক্তরাজ্যের ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে মার্কিন মডেল অনুসরণ করেছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে গুম একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। এ অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে আমরা ১ হাজার ৮০০টির মতো অভিযোগের মধ্যে থেকে ২৫৩ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পুনরায় ফিরে আসার সময়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যা প্রমাণ করে তারা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে ছিলেন।

এ ২৫৩ জনের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা এক দশকের বেশি সময়জুড়ে একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন; তাদের বয়স, পেশা এবং গুমের সময়কাল বিভিন্ন রকম। তবুও তাদের অভিজ্ঞতা বিস্ময়করভাবে মিল খুঁজে পায়। অধিকাংশই তৎকালীন বিরোধী দলের সমর্থক ছিলেন এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়বস্তু ছিল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। এমনকি যারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারাও নিখোঁজ হয়েছেন দলীয় দ্বন্দ্ব বা অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। সব ক্ষেত্রেই তাদের একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাগত নির্যাতন, সন্ত্রাসী হিসেবে মিডিয়ায় উপস্থাপন, একই ধরনের মামলায় অভিযুক্ত করা এবং একই ভাষায় বর্ণনা।

গুম কমিশনের এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়, বিগত ১৬ বছরের বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতার নিখোঁজ কিংবা গুমের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসার ঘটনার মধ্য দিয়ে।

২০১৭ সালের ২৬ মে নরসিংদীর বালুয়াকান্দি গ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের ৪ নেতাকে ধরে নিয়ে যায় রায়পুরা থানা পুলিশ। এরপর থেকে তাদের খোঁজ নেই বলে দাবি করেন স্বজনরা। ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে নি‌খোঁজের দুদিন পর সড়কের পাশ থেকে অচেতন ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আওয়ামী লীগের শাহ আলম নামের এক নেতা‌কে উদ্ধার ক‌রে‌ স্থানীয়রা। ২০২২ সালের জুলাই মাসে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হন আওয়ামী লীগ নেতা ও পল্লী চিকিৎসক জাফর উল্যাহ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার তেজগাঁওয়ের বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নান। এখনও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। একই সময়ে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে নিখোঁজ হন আরেক আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আবছার।

ধারণা করা হয়, দলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি হন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এসব নেতা।

সময়ের আলো/এমএইচ


Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: