ঝালকাঠির বিলাতি গাব একটি জনপ্রিয় ফল যা সাধারণত ‘গাব’ নামেই পরিচিত। এটি ঝালকাঠি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ফল এবং স্থানীয়ভাবে এর বেশ কদর রয়েছে। বিলাতি গাব দেখতে অনেকটা আপেলের মতো এবং এর ত্বক হালকা বাদামি ও লোমশ হয়ে থাকে। এর মাংসল অংশ হালকা ক্রিম রঙের হয়ে থাকে এবং খেতে বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই ফলটি সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকে এবং গ্রামাঞ্চলে অযত্নে বেড়ে ওঠে।
বিলাতি গাব ঝালকাঠি জেলার একটি পরিচিত ফল এবং এটি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। কিছু বৈশিষ্ট্য যা এই ফলটিকে বিশেষ করে তোলে-মিষ্টি ও সুস্বাদু। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও আয়রন থাকে যা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী। গাছ কোনো বিশেষ যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে। আষাঢ় মাসের শেষের দিকে পাকে। ঝালকাঠি জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এটি পাওয়া যায়।
জানা গেছে, কোনো ধরনের বপন, রোপণ, যত্ন ও পরিচর্যা ছাড়াই বাগানে জন্ম নেয় বিলাতি গাব গাছ। ৫ বছর বয়স হলেই দেওয়া শুরু করে ৩০০ গ্রাম ওজনের লাল রঙের ফল। যা স্থানীয় ভাষায় বিলাতি গাব হিসেবেই পরিচিতি। সুস্বাদু ফলটি এখন গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গ্রামাঞ্চল থেকে মাইকিং করে সংগ্রহ করছেন পাইকাররা। প্রতি কুড়ি বিলাতি গাব আকারভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কেনেন তারা। এরপর প্রতিদিন যাত্রীবাহী পরিবহনে করে পৌঁছে দেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেট শহরে গাব পাঠানো হয়।
রাজাপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ক্লাব এলাকায় মোকাম তৈরি করেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তিনি গ্রাম থেকে গাব সংগ্রহ করে পাইকার খলিল হাওলাদারের কাছে বিক্রি করেন। তার সঙ্গে আরও ১০-১২ জন সহযোগিতা করেন। তারা সবাই এ মৌসুমে গ্রাম থেকে বিলাতি গাব সংগ্রহ করে প্যাকেট করতে সহযোগিতা করেন।
ব্যবসায়ী খলিল হাওলাদার জানান, পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাইকিং করে গাব সংগ্রহ করা হয়। গাবের আকারভেদে প্রতি পিস ৪-৫ টাকা করে দেওয়া হয়। এরপর মোকামে এনে পাশের পুকুরে নিয়ে ধুয়ে ময়লা পরিষ্কার করা হয়। এতে গাবের উজ্জ্বলতা বাড়ে। এরপর প্লাস্টিকের ক্যারেটের মধ্যে কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে গাব রাখা হয়।
তিনি জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেটসহ দেশের বড় শহরে যাত্রীবাহী পরিবহনে ওইসব শহরের আড়তদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তারা কেজি হিসাবে বিক্রি করে পাওনা টাকা পাঠিয়ে দেন। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে এ ব্যবসা চলে। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে অন্য ব্যবসা একই নিয়মে করা হয়। এলাকাবাসী জানায়, পাকা গাবের মৌসুম আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস। এ সময় জেলার বিভিন্ন বাজারে পাকা গাবের ঘ্রাণে মন মাতোয়ারা হয়ে যায়। ঝালকাঠি শহরের বড় বাজার, চাঁদকাঠি বাজার, কলেজ মোড়, কাঠপট্টি, রাজাপুরের বাগড়ি বাজার, সদরের বাজার, পুটিয়াখালী, লেবুবুনিয়া বাজার, পাকাপুল বাজার, গালুয়া বাজার, নলবুনিয়া বাজার, ফকিরের হাট, চাড়াখালির হাট, বাদুরতলা হাট, কাচারি বাড়ির হাট, বলারজোর হাট, গাজির হাট, পাড়ের হাট, বাইপাস মোড় বাজারসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে এবং বাড়ি বাড়ি থেকে ব্যবসায়ীরা গাব পাইকারি হিসাবে কিনে দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দরে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করছেন।
রাজাপুরের গালুয়া বাজারের পাইকারি গাব ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, পাকাপুল বাজারের হারুন সরদার জানান, জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে ১ কুড়ি (২০টি) পাকা গাব আকার অনুযায়ী ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কেনা যায়। পরে ১০০টি গাব আড়তে পাইকারি বিক্রি হয় ৭০০-৮০০ টাকায়। শহরের আড়তদাররা প্রতিটি গাব ভোক্তাদের কাছে ১০-১২ টাকা হারে বিক্রি করেন।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের মাটি বেশ উর্বর। তাই সব ফলের পাশাপাশি গাব ফলেরও ফলন বেশি। তা ছাড়া প্রতি বছরই এ অঞ্চলে গাবের বাম্পার ফলন হচ্ছে।
এ গাব স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে। ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মেহেদী হাসান সানি জানান, গাব ফরমালিন ও ভেজালমুক্ত একটি দেশীয় ফল। এটি যেমন মজাদার ঠিক তেমনি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ।
ক্যাপশন: সংগ্রহ করা গাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর জন্য প্যাকেটজাত করা হচ্ছে
সময়ের আলো/এমএইচ