রোগী-স্বজনদের আহাজারিতে ভারী বার্ন ইউনিটের বাতাস

গোলাম মোস্তফা

প্রথম পাতা

আমার ছোট্ট বাবাটার শরীর পুড়ে গেছে, মুখ, হাত-পা ঝলসে গেছে, মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ও

2025-07-22T08:53:29+00:00
2025-07-22T11:09:12+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা
‘ও আল্লাহ আমার বাচ্চাকে একটু শান্তি দাও, কেড়ে নিও না’
রোগী-স্বজনদের আহাজারিতে ভারী বার্ন ইউনিটের বাতাস
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫, ৮:৫৩ এএম  আপডেট: ২২.০৭.২০২৫ ১১:০৯ এএম
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা আগুনে দগ্ধ এক শিক্ষার্থী। ছবি: সময়ের আলো
আমার ছোট্ট বাবাটার শরীর পুড়ে গেছে, মুখ, হাত-পা ঝলসে গেছে, মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ও আল্লাহ আমার বাবাটার সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও। আমার বাচ্চাকে একটু শান্তি দাও। সকালে আমি এক টেবিলে বসে খাওয়াইলাম। এখন হাসপাতালে ভর্তি। কী থেকে কী হয়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল। এভাবেই হাউমাউ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের সামনে বসে বিলাপ করছিলেন বাবা মো. মহসিন হোসেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তার সপ্তম শ্রেণিতেপড়ুয়া ছেলে মাতিন হোসেনের জন্য কাঁদছিলেন। হাসপাতালের ৫২০ নম্বর কক্ষের মেঝেতে মেয়েকে ধরে হাউমাউ করে বিলাপ করছিলেন মা ইয়াসমিন আক্তার। তার ১১ বছর বয়সি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে নুরে জান্নাত ইউশার পিঠও পুড়ে গেছে।

তিনি সময়ের আলোকে জানান, আমার মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। মেয়ে বলেছে মা শরীরের জ্বালাপোড়া সহ্য করতে পারছি না। এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তার কান্নায় বার্ন ইউনিটের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। কোনোভাবেই তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না পরিবারের লোকজন। কান্নার একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।

সোমবার দুপুরের পর থেকেই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের আনা হয় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে আসছে দগ্ধরা। তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদের ভিড় আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বার্ন ইনস্টিটিউটের মূল চত্বর। স্বজনদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা আহতদের হাসপাতালে দেখতে আসায় বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয় চিকিৎসক-নার্সদের। এই নিয়ে রোগীদের স্বজনদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

সরেজমিন দেখা গেছে, কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে আসছেন পরিবার-পরিজন। যেখানে বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধদের ভর্তি করা হয়েছে। তাদের কারও সন্তান মারা গেছে আবার কারও সন্তানের শরীর থেকে ৭০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে, আবার কারও ৪০, ৩০, ২০ এবং ১০ শতাংশ কম-বেশি দগ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর থেকে কারও কারও সন্তানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে প্রিয় সন্তানদের খোঁজে বার্ন ইউনিটে ছুটে আসছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সন্তানের খোঁজে আসেন, কেউ আসেন ছোটভাই, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগনে-ভাগনির খোঁজে। তাদের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কারও কারও কান্না থামানো যাচ্ছিল না। রোগী-স্বজন ছাড়াও হাসপাতালজুড়েই ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। বিশেষ করে হাসপাতালে বাইরে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। আর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক-নার্সদের।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, যারা আহত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই শিশু। তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সবচেয়ে  ক্রিটিক্যাল রোগীরা এই বার্ন ইনস্টিটিউটে আছে। অতিরিক্ত ক্রিটিক্যাল দগ্ধ রোগীদের ইনডোর ও ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেককেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগেরই শরীরের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ৭০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছে। আর আহতের মধ্যে আইসিইউতে ৯ জন ভর্তি রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি কনফারেন্স রুম ও স্টাফ ওয়ার্ডও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা গুরুতর আহত হয়েছে তারা হলোÑমাসুকা, বাপ্পী সরকার, মাহতাব, নাফিজ, শামীম, শায়ান ইউসুফ, সায়মা, মাহিয়া, আফরান এবং মাহরিন চৌধুরী । তাদের মধ্যে কারও ৮০ শতাংশের বেশি দগ্ধ, আবার কারও ৭০, ৬০, ৪০, ৩০, ২০ এবং ১০ শতাশের বেশি বা কম দগ্ধ হয়েছে।

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ১১ বছর বয়সি আরিয়ানের সারা শরীর পুড়ে গেছে। তাকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতাল থেকে আরিয়ানকে বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেয় উন্নত চিকিৎসার জন্য।

এখানে জরুরি বিভাগের ভেতরে চিকিৎসা চলছিল, বাইরে বসে তার মা মনিকা আক্তার আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আল্লাহ আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরাইয়া দাও।
তিনি সময়ের আলোকে জানান, আমার ছেলে সকাল পৌনে ৮টায় স্কুলে গেছে। দেড়টায় ছুটি হওয়ার কথা ছিল, এরপর দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কোচিং। সকালে ছেলেকে খাবার দিয়ে দিছি, এর মধ্যে এই ঘটনা ঘটল।

উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের এই বাসিন্দা বলেন, সকালে সুস্থ ছেলেটা বাসা থেকে বের হলো, আমি কী অপরাধ করেছি, আল্লাহ কেন আমাকে এই শাস্তি দিলেন। এই বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

হাসপাতালের আইসিইউর সামনে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া জুনায়েদ হাসানের মা ঝরনা আক্তার। তিনি জানান, সুস্থ ছেলেকে স্কুলে পাঠাইলাম এখন আমার সোনাটা আইসিউতে। আপনারা দোয়া কইরেন। আমার ছেলের যেন কিছু না হয়। আমার ছেলের কিছু হলে আমি বাঁচব না। এই বলে কেঁদে ফেলেন। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের করিডোরে কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল হোসেন।

তিনি জানান, আমার ছেলে ক্লাস শেষ হলেও বৃত্তির কোচিংয়ের জন্য স্কুলে থেকে যায়। কিন্তু এক অভিশপ্ত বিমান দুর্ঘটনা আমার ছেলেকে নিয়ে গেল। চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম। কী নিয়ে আমি এখন বাঁচব। কে আমাকে বাবা বলে ডাকবে। আমার তো সব শেষ। বুক চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জানা গেছে, তানভীর মাইলস্টোনে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল। একই স্কুলে তার ছোট ভাই তাশফিক পড়াশোনা করে। স্কুল ছুটি হওয়ায় তাকে নিয়ে বাসায় চলে যান বাবা। তবে বৃত্তির কোচিং করতে থেকে যায় তানভীর। 

কাঁদতে কাঁদতে তানভীরের চাচা শাহ আলম বলেন, বৃত্তির জন্য সে কোচিং করছিল। আমার ভাতিজা প্রথম ছাড়া কখনো দ্বিতীয় হয়নি। সে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। সে ক্লাসের ক্যাপ্টেন ছিল। আমরা প্রথমে খবর পাইনি। পরে উত্তরাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজেছি। পরে শুনলাম এখানে আছে। এমন বাচ্চার মৃত্যু কেমনে মেনে নেব। 
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে কিছুক্ষণ পরপর যখন কোনো অ্যাম্বুলেন্স আসছিল তখই বাঁশি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল স্বজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের। দগ্ধদের দ্রুত নেওয়া হয় জরুরি বিভাগে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ জানায়, যেসব রোগীদের অবস্থা স্থিতিশীল, তাদের স্বজনরা যেন হাসপাতালে ভিড় না করে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না এবং পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে অবস্থানরত এক নিরাপত্তাকর্মী সময়ের আলোকে বলেন, দুপুরের পর থেকে মানুষের ভিড় বাড়ছে। এত মানুষ একসঙ্গে এসেছে যে আমরা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। অনেকে কান্নাকাটি করছে, কেউ স্বজনের খোঁজে হাহাকার করছে। কিন্তু এখানে ভিড় করলে রোগীদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। এটা আমরা কাউকে বুঝাতে পারছি না।

তবে কেউ কেউ এসেছেন স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে। সন্ধ্যার পরও নানা বয়সি মানুষের ভিড় কমছে না, বরং বাড়তে দেখা গেল। সেই দলে নারী-পুরুষ, তরুণ, মাঝবয়সি সবাই আছেন। আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যাদের কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই, তারা এসেছেন কেবলই মানবিক আবেদনে সাড়া দিতে।


Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: