ঢাকায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত স্কোয়াড্রন লিডার তৌকির ইসলাম সাগরের মৃত্যুর খবরে রাজশাহীতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রাজশাহী নগরীর সপুরা এলাকায় জমি কিনেছিলেন তৌকিরের বাবা। সেই জমিতে গত বছর থেকে বাড়ি নির্মাণের কাজও শুরু করেছিলেন। কাজ এখনও শেষ হয়নি। সেই বাড়িটিতে আর ওঠা হলো না তৌকিরের।
রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ৩ নম্বর সেক্টরের ২২৩ নম্বর বাড়িটিতে ভাড়া থাকেন তৌকিরের বাবা তহুরুল ইসলাম, মা সালেহা খাতুন এবং ছোট বোন সৃষ্টি খাতুন। সঙ্গে থাকতেন বোন জামাই। আশপাশের মানুষরা জানান, এই পরিবার অত্যন্ত মিশুক। তৌকির ছিলেন ভদ্র ও মেধাবী তরুণ। তাদের বাসার সামনে সোমবার বিকাল থেকে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনরা। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউ কেউ হতভম্ব হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ‘আশ্রয়’ নামের সেই বাসার সামনে। তৌকিরের পরিবার প্রায় ২৫ বছর ধরে রাজশাহীতে ভাড়া থাকেন। সবশেষ তারা ‘আশ্রয়’ নামের এই বাড়িটির তিন তলায় উঠেছেন। তৌকির ছিলেন দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড়। তার ছোট বোন সৃষ্টি খাতুন রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজে এমবিবিএসের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
সোমবার বিকালে বাসার সামনে উপস্থিত ছিলেন নিহত পাইলটের মামা রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, বিকাল ৫টার দিকে র্যাবের একটি গাড়িতে করে তৌকিরের বাবা-মা, বোন সৃষ্টি খাতুন, বড় বোন বৃষ্টি খাতুন ও তার স্বামী ডা. তুহিন ইসলাম এবং আরেক মামা মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দর থেকে তাদের বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় নেওয়া হয়। তৌকিরের মামা রফিকুল ইসলাম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এরকম ভালো ছেলে আমি আর দেখিনি। তার মতো পরিশ্রমী, ভদ্র, মেধাবী ছেলেকে এভাবে হারিয়ে ফেলব ভাবতেই পারিনি। মামা রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, বাড়িতে কেউ নেই।
তৌকিরের দুর্ঘটনার খবরে সবাই ঢাকা গিয়েছে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন। এ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। তারা সবাই মানুষ হিসেবে অনেক ভালো। তার মৃত্যুর খবরে স্বজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই গ্রামের বাড়ি শিবগঞ্জ থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা করেছেন। জানি না সর্বশেষ পরিস্থিতি। ঢাকায় স্বজনরা রয়েছে।
নিহত তৌকির ইসলাম সাগরের স্ত্রী ঢাকায় সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারার। বছরখানেক আগে বিয়ে করেছিলেন তৌকির ইসলাম। তৌকিরের বাবা তহুরুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হলেও গত প্রায় ২৫ বছর ধরে পরিবার নিয়ে রাজশাহীতেই বসবাস করছেন। পেশায় তিনি আমদানি-রফতানি ব্যবসায়ী।
তৌকির রাজশাহীর নিউ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে পাবনা ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি ওই কলেজের ৩৪তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ২০১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তৌকির যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে। তৌকিরের মৃত্যুর খবর শুনে বাড়ির সামনে আসেন পাবনা ক্যাডেট কলেজে তার সাবেক প্রশিক্ষক মোস্তাক আহমেদ। তিনি বলেন, তৌকির খুবই মেধাবী, ভীষণ ভদ্র এবং শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। সে ছোটদের স্নেহ করত, বড়দের সম্মান দিত। ওর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
দুর্ঘটনার খবরে তৌকিরের উপশহরের বাসায় এসেছেন বিমানবাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মোস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, সে নম্র, ভদ্র ও স্মার্ট। একজন দক্ষ মানুষ। শুরু থেকেই তার পাইলট হওয়ার ইচ্ছা। সে পাইলট হিসেবেও ভালো। তাকে ছোট থেকে দেখছি। তার এমন খবরে আমি নিজেও মর্মাহত। গত এক মাস আগেও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তার শিক্ষাজীবন ভালো ছিল। পাবনা ক্যাডেট কলেজের আগে রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি।
বাড়ির মালিক আতিকুল ইসলাম জানান, তৌকির ইসলাম সাগর প্রথমবারের মতো একা প্রশিক্ষণ বিমান চালাবেন এই খবরে পুরো পরিবারের সদস্যরা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত ছিলেন। (সোমবার) দুপুরের পর তারা বিমান বিধ্বস্তের খবর পান। সে সময় জানতে পারেন সাগর ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি আরও জানান, সাগরকে দেখতে পরিবারের সদস্যরা বিমানযোগে ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে র্যাবের একটি মাইক্রোবাসে করে ভাড়া বাসা থেকে তাদের রাজশাহী শাহমখদুম বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তারা ঢাকা রওনা হন। আতিকুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের বাবা, মা, বোন ও বোন জামাই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তার মৃত্যুর খবর জানতেন না।
প্রসঙ্গত, সোমবার রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির নিহত হন।