রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ট্র্যাজেডি এখন শোকগাথা একটি কালো অধ্যায়ের নাম। বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে কেড়ে নেয় কমপক্ষে ২৬ শিশু শিক্ষার্থীর প্রাণ। এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে অনেকে। অথচ হতাহতের শিকার এই শিশুদের প্রায় সবার পরিবারই আর্থিকভাবে সচ্ছল। অনেকের পরিবার অঢেল অর্থবিত্তের মালিক। কিন্তু নিয়তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কিছুই করার নেই পরিবারগুলোর। নয়নের মণি, বুকের ধন সন্তানের জীবন বাঁচাতে কাজে আসছে না অর্থবিত্তের কিছুই। যারা সন্তান হারিয়েছেন তারা শোকে পাথর হয়ে স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন।
নিহতদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের কারও পিতা বড় ব্যবসায়ী, কারও পিতা সরকারি বড় কর্মকর্তা, কারও পিতা প্রবাসী। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ভর্তি করেছিলেন মাইলস্টোন স্কুলে। যাতায়াত সুবিধার জন্য পরিবারসহ বসবাস করতেন স্কুলের আশপাশের এলাকাতেই। এ জন্য অনেকেই বাড়ি করেছেন বা ফ্ল্যাট কিনেছেন স্কুলটির আশপাশে। অথচ যে সন্তানের কথা চিন্তা করে এতকিছুÑসেই সন্তানই আজ নেই। চিরনিদ্রায় শায়িত করার পর তারা আহাজারি করেই যাচ্ছেন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন আবদুল্লাহ শামীম। মাত্র আট মাস আগে সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় মারা যান তার বাবা আবুল কালাম। ছেলেমেয়েদের বুকে জড়িয়ে ধরে সেই শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন শামীমের মা জুলেখা বেগম। কিন্তু তার আগেই ছেলে হারানোর শোক তার বুকে পাথরের মতো চেপে বসল। যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শামীমকে গত মঙ্গলবার সকালে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএম খালি মাঝিকান্দি এলাকায় বাবার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে। শামীমের এই মৃত্যু মানতে পারছেন না তার পরিবারের কেউ।
শামীমের বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আমার বড় বোন ফারজানা কণিকা ও আমি যখন খুব ছোট তখন আব্বু আমাদের পরিবারসহ সৌদি আরবে নিয়ে যান। আব্বু ফল এক্সপোর্টের ব্যবসা করতেন। আর্থিক সংকট না থাকায় সেখানে আমরা বেশ ভালোভাবে চলতাম। আমি আর আপু মক্কায় কাবাঘরে গিয়ে একটা ছোট ভাইয়ের জন্য দোয়া করতাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার ভাইটা (শামীম) ২০১১ সালের ২৯ জুলাই সৌদি আরবেই জন্মগ্রহণ করে। এরপর ২০১৩ সালে আমরা দেশে ফিরে আসি। শামীম উত্তরার তানজিমুল উম্মাহ মাদরাসায় পড়ত। বাবা মারা যাওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাইলস্টোনে ভর্তি করা হয় শামীমকে।
জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, শামীম অনেক বুদ্ধিমান ও সাহসী ছিল। ছোটবেলা থেকেই আব্বু ওর কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেননি। ডুপ্লেক্স বাড়ির শখ করেছিল। উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে ৫ তলা বাড়ির যে ফ্ল্যাটে আমরা থাকি, সেটি ওর জন্যই ডুপ্লেক্স করেছিলেন আব্বু। আমাদের গাড়িটাও শামীমের পছন্দ অনুযায়ী কেনা।
তিনি বলেন, আমার বাবা ৩২ বছর সৌদি আরবে ব্যবসা করেছেন। এখনও সেখানে বিভিন্ন মানুষের কাছে আমরা ১০ লাখ রিয়াল পাব। ওই টাকা বুঝে পেতে শামীমসহ আমাদের সৌদি আরবে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তি শামীমকে কবরে পাঠিয়ে দিল।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর যখন শামীমকে বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন ও বারবার বলছিল বার্ন ইউনিট এত দূরে কেন ভাইয়া? উত্তরার কাছাকাছি একটা বার্ন ইউনিট থাকতে পারল না। আমাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাইতে পারলা না?
আমি (শামীম) একটু সুস্থ হলে দেশের বাইরে নিয়ে যেও। আমার বন্ধুরা কেমন আছে? ওদের খোঁজ নিও। শেষ সময়েও শামীম ওর বন্ধুদের খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু আফসোস ভাইটাকে বাঁচাতে পারলাম না। সুযোগ থাকলে সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতাম। ওরে সুস্থ করতে ২০ কোটি টাকা লাগলেও আমরা পিছপা হতাম না। আমার আব্বু আমাদের জন্য অনেক কিছু রেখে গেছেন। প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা বাসাভাড়া পাই। এসবের কিছুই কাজে লাগল না। ভাই আমার এখন অনেক দূরে। ওর শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। অথচ আগামী ২৯ জুলাই ওর জন্মদিন। দিনটি ঘিরে কত পরিকল্পনা ছিল আমাদের।
শামীমের পরিবারের মতোই আক্ষেপে পুড়ছে আরও অনেকের পরিবার। যারা সন্তানকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারেননি। এখনও যারা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তাদের অনেকের পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েও কিছুই করতে পারছেন না। তাই তো অনেকেই সন্তানের জীবন বাঁচাতে হাসপাতালে বিরামহীনভাবে নফল নামাজ পড়ছেন, কেউ তসবি পড়ছেন, কেউ চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়তে পড়তে আল্লাহর কাছে সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছেন।
কেউ শোকে কেউ শঙ্কায় কাঁদছেন : আইসিইউয়ের ১৫ নম্বর বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে মাইলস্টোন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারাবি আয়ান। তার মামা জায়িদী রায়হান জানান, আয়ানের বাবা জুনায়েদ আহমেদ ও মা তামান্না আক্তার দুজনই অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা। ফারাবির এই করুণ পরিণতি মানতে পারছেন না ওর বাবা-মা। দুজনই কান্না করে যাচ্ছেন অবিরত।
গত মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ওয়ার্শি ইউনিয়নের নগরভাত গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে মাইলস্টোনের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তানভীর আহমেদকে। তার বাবা রুবেল মিয়া পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল তার পরিবার। ফাতেমার মৃত্যুর পর দেশে ছুটে আসেন তার কুয়েত প্রবাসী বাবা বনি আমিন। এক দিনের ব্যবধানে দুই আদরের ধন নাজিয়া (১৩) ও নাফিকে (৯) হারিয়ে পাগলপ্রায় তাদের বাবা-মা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শিশু দুটির বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম নীরব ও মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়িয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন। কিন্তু তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।
এএডি/