গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ও ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে একে একে বের হয়ে আসে থলের বিড়াল। বেরিয়ে আসে শেখ হাসিনার পরিবারের যত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য। ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমি, ফ্ল্যাটসহ নানা সম্পদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অনুসন্ধানে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পায় সংস্থাটি। ফলে সংস্থাটি আদালতে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পত্তি জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করেন আদালত। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নামে ঢাকা, খুলনা ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় থাকা বিভিন্ন সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ইতিমধ্যে শেখ পরিবারের সদস্যদের ১ হাজার ৬৫ কোটি ৭৮ লাখ ২২ হাজার ১১৮ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে তাদের নামে থাকা সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং তাদের ১২৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব অ্যাকাউন্টে ৫৭৭ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা জমা রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নামে বরাদ্দ নেওয়া প্লটের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা করে দুদক।
জানা গেছে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের রাজধানীর বারিধারায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা মূল্যের প্লট রয়েছে। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে খুলনার দিঘলিয়ায় ৮৭.৭০ শতাংশ জমি, দলিলমূল্য ৬১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, শেখ রেহানার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯ শতাংশ জমি, দলিলমূল্য ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও আজমিনা সিদ্দিকের খুলনার দিঘলিয়ায় ৮৭.৭০ শতাংশ জমি রয়েছে যার দলিলমূল্য ৪১ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা। গত ২৯ এপ্রিল সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের গুলশানের ফ্ল্যাট জব্দ করা হয়। গত ৫ মার্চ পুতুলের সূচনা ফাউন্ডেশনের ১৪টি ব্যাংক হিসাবে ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়।
দুদক সূত্র জানায়, দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও বোন শেখ রেহানার নামে থাকা সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং তাদের ১২৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদের নামে থাকা ধানমন্ডি ৫ নম্বর রোডের ১৬ কাঠা আয়তনের ৫৪ নম্বর সুধাসদন নামের বাড়িটি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের নামে গুলশানের ৭১ নম্বর রোডের ১১ নম্বর ইস্টার্ন হারমনি ভবনের ২৪৩৬ বর্গফুট আয়তনের বি/২০১ নম্বর ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। শেখ রেহানার নামে থাকা রাজধানী সেগুনবাগিচার ৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের ২০৬ নম্বর ফ্ল্যাট, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের সফিপুর এলাকার ৮ দশশিক ৫ শতাংশ জমি, একই এলাকায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ জমি ক্রোক করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে থাকা নিকেতন এলাকার সাত তলা বাড়ির চার তলায় কার পার্কিংসহ ১৯২০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং একই আয়তনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই এলাকার অন্য একটি ভবনের কার পার্কিংসহ দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম তলায় ১৮০০ বর্গফুট করে চারটি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার গাজীপুরের সম্পদও ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদকের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, অভিযোগ-সংশ্লিষ্টরা অস্থাবর সম্পদ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এসব ব্যাংক হিসাব অবিলম্বে অবরুদ্ধ করা আবশ্যক। সেই আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত ১২৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন। যাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া তারা হলেন-শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানাসহ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সেন্ট্রাল ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই), সূচনা ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ শেখ পরিবারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব। এসব ব্যাংক হিসাবে কোনো লেনদেন করা যাবে না।
সপরিবারে শেখ হাসিনার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : গত বছরের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তার পরিবারের সদস্যরাও বিদেশে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নামে বিপুল অর্থ লোপাটসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এ কারণে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন দুদকের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেন। নিষেধাজ্ঞা পাওয়া অন্যরা হলেন-শেখ হাসিনার ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা, শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।
আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নামে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অভিযোগটি অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান চলার সময় বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সপরিবারে গোপনে দেশত্যাগ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা দেশত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে গেলে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া সার্বিক অনুসন্ধান কাজে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ সমূহ ক্ষতির কারণ রয়েছে। সে জন্য অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান কার্যক্রমের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার স্বামী ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও তাদের সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির নামে থাকা ২৩১ শতক জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ জুলাই ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিব এ আদেশ দেন। আবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ চলমান রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে ১৮টি দলিলে কেনা জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব জমি রয়েছে গাজীপুরে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানা ও তার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক এবং ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের জমি ও প্লট জব্দের আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। তার আগের দিন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে থাকা গুলশানের ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে আদালত ফ্ল্যাটটি দেখভালে তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেওয়ার আদেশ দেন।
অন্যদিকে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের পাঁচ সদস্যের বাড়ি ও জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। জব্দ হওয়া সম্পত্তির মধ্যে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের রাজধানীর বারিধারার ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বাড়ি রয়েছে। খুলনার দিঘলিয়ায় শেখ রেহানা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে থাকা ৬১ লাখ ৮৭ হাজার টাকার ৮৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়া একই জায়গায় রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব ববি এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের ৪১ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকার ৮৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জমি রয়েছে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ রেহানার নামে থাকা ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকার ১৯ শতাংশ জমিও রয়েছে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল স্থাবর সম্পদ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। মামলা নিষ্পত্তির আগে সম্পদ হস্তান্তর বা স্থানান্তর হয়ে গেলে অনুসন্ধানে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের স্থাবর সম্পদ-সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন-স্থানান্তর বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করতে যাতে না পারেন এ জন্য এগুলো জব্দ করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ৯টি প্রকল্প থেকে মোট ৮০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক তদন্ত শুরু করে। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর দুদক হাসিনা এবং জয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে। সেই সঙ্গে পূর্বাচল নিউটাউন প্রকল্পের প্লট পেতে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং তাদের পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে দায়ের করা ছয়টি মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদন করে দুদক।
শেখ রেহানার স্বামীর ১৫ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত : শেখ রেহানার স্বামী শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও দেবর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নামে থাকা গাজীপুর সদরের জমি ও একটি ১০ তলা বাড়ি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এসব স্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ১৫ কোটি। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন গালিব এ আদেশ দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্তরা এসব সম্পদ হস্তান্তর বা গোপন করার চেষ্টা করছেন। তদন্ত চলাকালে সম্পদের মালিকানা যেন পরিবর্তন বা স্থানান্তর করা না হয়, সে লক্ষ্যে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করা হয়। আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেছে। দুদক জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং তাদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারিক আহমেদ সিদ্দিক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। এর আগে আদালত তার ও পরিবারের নামে থাকা ২৪ বিঘা জমি, ৫টি প্লট ও ৫টি ফ্ল্যাট বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি তারিক আহমেদ সিদ্দিকের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও জারি করে আদালত।
শেখ হাসিনা পরিবারের ৩৯৪ কোটি টাকা অবরুদ্ধ : দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের নামে ৩১টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৩৯৪ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার ৮০৫ টাকা দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অবরুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন রেহানা সিদ্দিক এবং তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ৩১টি অ্যাকাউন্টের অস্থাবর সম্পদ সমূহ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন।
শেখ সেলিম ও তার পরিবারের ৫ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ : আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সন্তান এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ফজলে ফাহিমসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখা হয়েছে। গত বছরের ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়ে অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে বলেছে। হিসাব জব্দ করাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সব লেনদেন বন্ধ থাকবে।
লেনদেন স্থগিত করার এ নির্দেশের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা সংশ্লিষ্ট ধারা প্রযোজ্য হবে বলে বিএফআইইউর চিঠিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তার স্ত্রী ফাতেমা সেলিম, ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম, শেখ ফজলে নাইম এবং মেয়ে শেখ আমিনা সুলতানা সানিয়ার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিএফআইইউর নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কোনো হিসাব স্থগিত করা হলে হিসাব সংশ্লিষ্ট তথ্য বা দলিল যেমনÑহিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি ও লেনদেন বিবরণী ইত্যাদি চিঠি দেওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের কাছে পাঠানোর জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানের ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার কাজে পছন্দের ঠিকাদারের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন গ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে গোপালগঞ্জেরই ১১টি উন্নয়ন কাজ ১১টি প্যাকেজে ভাগ করে ঠিকাদার নির্ধারণ হতো। এসব প্যাকেজে বাউন্ডারি ওয়াল, বিদ্যুতের সাব-স্টেশন, গ্যালারি শেড, স্টেডিয়াম সংস্কার ও উন্নয়ন, হোস্টেল কাম অফিস ভবন, উইমেন স্পোর্টস কমপ্লেক্সে জিমনেসিয়াম, স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সে গ্যালারি চেয়ার স্থাপনসহ নানা নির্মাণকাজের তথ্য রয়েছে। যার মধ্যে বিএফএল/এইচএলসি-জে/ভি নামে ১২ কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার; কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১১ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার; মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১০ কোটি ২২ লাখ ৫৬ হাজার; এ এস-এ এটকো-জে/ভি নামে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মার্কেন্টাইল করপোরেশনের নামে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার, বিএফএল-এএলসিএল জে-ভি নামে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার, কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার, মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১১ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দ : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাপসের স্ত্রী আফরিন তাপস শিউলি, ছেলে শেখ ফজলে নাশওয়ান এবং তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হিসাব জব্দের নির্দেশনা পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
দুদক সূত্র জানায়, এ ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৭৩ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জন করেছেন-এ অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে তার এ সম্পদ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ওই মামলায় বলা হয়েছে, শেখ তাপসের ২৭টি ব্যাংক হিসাবে ৫৩৯ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার ২৭৮ টাকা ও ৫ লাখ ১৭ হাজার ৫২৭ ডলারের অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলায় তাপসের স্ত্রী আফরিন তাপসও ৬ কোটি ৪০ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ৯টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৭০ কোটি ৮৯ লাখ ৯৩ হাজার ৬৬৯ টাকা ও ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৩ ডলারের অস্বাভাবিক লেনদেন করা হয়েছে।
অন্যদিকে দুদকের তদন্তে শেখ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। ২৭ এপ্রিল রাজউক থেকে ৩০ কাঠা প্লট গ্রহণের অভিযোগে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, রাদওয়ান মুজিব, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেওয়া হয়।
গত ২১ জুলাই সারা দেশে মুজিব শতবর্ষ পালন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ১০ হাজারেরও বেশি ম্যুরাল নির্মাণে অপচয়ের তথ্য চেয়ে ৬৪ জেলা পরিষদ বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাঠানো চিঠিতে মুজিববর্ষ পালনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, ব্যয় করা মন্ত্রণালয়ের নাম, ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ, ব্যয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তার নাম-পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছে।
৬৪ জেলা পরিষদ বরাবর পাঠানো চিঠিতে মুজিববর্ষ পালনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, ব্যয় করা মন্ত্রণালয়ের নাম, ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ, ব্যয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তার নাম-পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় কতগুলো এবং কোথায় ম্যুরাল তৈরি হয়েছে, ম্যুরাল নির্মাণে কত টাকা খরচ হয়েছে, ব্যয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছে। এই দুই অভিযোগ অনুসন্ধানে একজন উপ-পরিচালকের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করেছে দুদক। রেকর্ডপত্র দ্রুত দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ-ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করা হলো। বিষয়টি অতি জরুরি। অনুসন্ধানের জন্য সময়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ছয় অর্থবছরে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫ লাখ টাকা খরচ করেছে বলে জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অনিয়ম ও দুর্নীতি আকাশচুম্বী। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যেহেতু সংস্থাটির অনুসন্ধানে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। ফলে সংস্থাটি মামলা করেছে।
মামলা চলমান থাকায় এসব জমি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গত ১৫ বছরের শুধু শেখ হাসিনার পরিবারই নয়, তার সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও দুর্নীতি করেছে। এতে মামলার পরিমাণ বেশি। তার সরকারের মন্ত্রী-এমপিরও সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও জব্দ হয়েছে। আমার কাছে যতটুকু খবর আছে, আরও অনেকেরই বিরুদ্ধে মামলা হবে।
এ প্রসঙ্গে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আমরা যতগুলো অভিযোগ পেয়েছি-ওই সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হওয়ায় মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতে দুদক আবেদন করেছেন এসব জমি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করেছেন।
এমএইচ