উদ্বোধনের আগেই অপ্রত্যাশিত হুমকির মুখে সেতু

কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা

সারাদেশ

উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু এখন এক অপ্রত্যাশিত হুমকির মুখে। সেতুর মাত্র ৪০০-৫০০ মিটার দূরে চর

2025-08-05T01:26:28+00:00
2025-08-05T01:26:28+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
উদ্বোধনের আগেই অপ্রত্যাশিত হুমকির মুখে সেতু
চর হরিপুরে ড্রেজার দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন
কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫, ১:২৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু এখন এক অপ্রত্যাশিত হুমকির মুখে। সেতুর মাত্র ৪০০-৫০০ মিটার দূরে চর হরিপুর এলাকায় তিস্তা নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র এই অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত, যা সেতুর ভিত্তি ও স্থায়িত্বের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। এমনকি প্রশাসনও তাদের দমনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হরিপুর গ্রামের গ্রাম পুলিশ মোজাহারের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর, সাইদুল, রেজাউল, ফারুক এবং ফুল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চর এবং মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দাপুটে এই চক্রটির অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলামও তাদের সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর-এলজিইডি গাইবান্ধা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। ‘চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড’ নামের একটি চীনা প্রতিষ্ঠান এই সেতুর নির্মাণকাজ করে। ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৯২৫ কোটি টাকা। এটি সারা দেশে এলজিইডির প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প।

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ধারা ৪-এর (খ) অনুযায়ী, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে এই আইন অমান্য করে সেতুর উত্তর-পূর্বে ৪০০-৫০০ মিটারের মধ্যে ড্রেজার বসিয়ে তিস্তা নদী থেকে তোলা হচ্ছে বালু। সেই সঙ্গে ভরাট করা হচ্ছে সড়কের পাশের জমি।

জানা গেছে, এই অবৈধ চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে স্থানীয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং থানা পুলিশ ড্রেজার উচ্ছেদ করতে গিয়ে তাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এমনকি গত ৫ জুলাই চিলমারী নৌপুলিশ একজনকে আটক করলেও, সংঘবদ্ধ বালু উত্তোলনকারী ও তাদের মাস্তানবাহিনী হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা হলেও, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও বালু উত্তোলন শুরু করেছে।

সেতুর এত কাছে বালু উত্তোলনের ফলে একাধিক গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু নির্মাণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে এবং নদীর তলদেশের গঠন দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে সেতুর মূল ভিত্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সেতুর স্থায়িত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ছাড়া বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাড়ে ভাঙন তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন নদীর স্রোত বাড়ে, তখন এই ভাঙন সেতুর সুরক্ষা দেয়াল এবং সংযোগ সড়কের ক্ষতি করতে পারে। সর্বোপরি বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট কম্পন সেতুর কাঠামোতে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সেতুর আয়ুষ্কাল কমিয়ে দেবে।

রোববার সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচে উত্তরপূর্ব পাশে নদীতে ড্রাম ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বাল্কহেড ভাসছে। এর ওপর একটি বালু তোলার যন্ত্র (ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন) বসানো হয়েছে। সেই যন্ত্র থেকে পাইপ নদীতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য পাশে পাইপ দিয়ে নদী থেকে বালু তুলে তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। নদী থেকে বালু তোলার কাজ তদারকি করছেন তিন-চারজন শ্রমিক আর চারপাশে পাহারা দিচ্ছেন আরও চার-পাঁচজন কর্মী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন কলেজ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে এই বালু উত্তোলনের কথা নিশ্চিত করে জানান, প্রশাসনের সঙ্গে গোলমালের পর কিছু দিন বন্ধ থাকলেও এখন আবার বালু তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, ‘নদীতে পাবলিকলি কেউ বালু তুলছে না, কেউ বালুর ব্যবসা করছে না।’ তিনি বরং সরকারিভাবে এলজিইডি বালু তুলতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর-এলজিইডি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী জানান, সেতুর কাছে বালু উত্তোলনের বিষয়ে তিনি অবগত নন। এলাকা পরিদর্শন না করে কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসনের অসহায়ত্ব এবং উদাসীনতাকে স্পষ্ট করে তোলে। এ বিষয়ে এলজিইডি গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী জানান, সেতুর আশেপাশে থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এতে সেতু ও সেতুর বেড়িবাঁধ ভেঙে যেতে পারে। বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আগামী ২৫ আগস্ট হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু উদ্বোধনের কথা থাকলেও, তার আগেই এই অবৈধ বালু উত্তোলনের কার্যক্রম সেতুর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। 

স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী চক্রের দাপট এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অকালেই ক্ষতির মুখে পড়বে।

এমএইচ


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: