যুক্তরাষ্ট্র শুল্কহার ২০ শতাংশ ধার্য করায় তৈরি পোশাক রফতানিতে জড়িত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি। ঠিক একই সময় চট্টগ্রাম বন্দরের বাড়তি ‘মাশুল’ ধার্য করার প্রস্তাব নিয়ে দেখা দিয়েছে অস্বস্তি। রফতানি বাণিজ্যে জড়িত ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি না ফিরতেই ঘাড়ে ঝুলছে ‘মাশুল’ খড়গ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হ্রাস করার আনন্দ মিলিয়ে গেছে ‘মাশুল’ নিয়ে উৎকণ্ঠা-দুশ্চিন্তায়। এ মাশুলকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা চড়া ‘মাশুল’ দিলে ভোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়বেন-এমন শঙ্কা অনেকের। এ ছাড়া বৈশ্বিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব কাটানো কঠিন মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর প্রতি অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে আয় বা লাভ করছে। গত অর্থবছরেও ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা আয় করেছে। এর আগের অর্থ বছরেও উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় করেছে। বর্তমান উৎপাদনশীলতা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরেও ভালো আয় হবে। এই অবস্থায় ব্যবসার ওপর মাশুলের খড়গ ঝুলিয়ে না রাখাই জরুরি।
গত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হ্যান্ডলিং চার্জ ছাড়াও নানা খাতে বিদ্যমান মাশুল বাড়ানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। বন্দর থেকে নতুন করে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ মাশুল বা চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে নৌ পরিবহন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন হয়ে গেছে। এখন বাস্তবায়নের পালা। অর্থাৎ, বাড়তি মাশুল বা চার্জ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। গেজেট হয়ে গেলেই শুরু হবে নতুন হারে মাশুল আদায়। গেল জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট করেন নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। এরপর থেকেই ব্যবসায়ী মহলে ‘মাশুল’ নিয়ে তোলপাড় চলছে। মাশুল বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় আগেভাগে তৎপর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় গড়ে ওঠা ১৯ প্রাইভেট আইসিডি। ইতিমধ্যে আইসিডি মালিকদের পক্ষ থেকে চার্জ বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়, পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বনিম্ন ২৯ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ চার্জ বাড়ানো হবে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আইসিডিগুলো বাড়তি চার্জ আদায় শুরু করবে।
‘মাশুল’ বৃদ্ধির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাব দুই মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, মাশুল বা চার্জ বৃদ্ধির জন্য পাঠানো প্রস্তাব ইতিমধ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে। এখন প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে যাবে। গেজেট হলেই কেবল নতুন ধার্য হারে মাশুল আদায় শুরু হবে। গেজেটের আগে নতুন হারে মাশুল আদায় শুরু হবে না। সবকিছু শেষ করতে ২-৩ মাস লাগতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বা বন্দর ব্যবহারকারীরা এই সময়ের মধ্যে মাশুল হ্রাসের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানালে সে ক্ষেত্রে বিবেচনা হবে কি না-এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ারে। সরকার চাইলে কমানো হ্রাস করতে পারবে। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, গেল ৪০ বছর পর ধরে পুরোনো হারে মাশুল আদায় হয়ে আসছে বন্দরে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বন্দর কর, বার্থিং ফি, ফর্কলিফট চার্জ ও অন্যান্য ইউটিলিটি খরচসহ মাত্র পাঁচটি সেবার হার সামান্য বাড়ানো হয়েছিল। অন্য সব ধরনের চার্জ ১৯৮৬ সালের পর থেকে আর বাড়ানো হয়নি। হঠাৎ করেই চার্জ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় চলছে নানা হিসাবনিকাশ। বন্দরের নতুন প্রস্তাবে প্রতিটি ২০ ফুট কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ১৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৩ দশমিক ১৫ ডলার এবং ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে ২২ দশমিক ৫০ ডলার থেকে ৩৪ দশমিক ৮৩ ডলার চার্জ ধার্য করা হয়েছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছাড়াও বেড়েছে জাহাজ পাইলটিং চার্জ। চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙর থেকে জেটি এবং জেটি থেকে বহির্নোঙর পর্যন্ত জাহাজ আনা-নেওয়া করেন চট্টগ্রাম বন্দরের নৌ বিভাগের নিজস্ব পাইলট। বিদেশি জাহাজ মালিকের কাছ থেকে শিপিং এজেন্টের মাধ্যমে পাইলট চার্জ আদায় হয়ে থাকে। সেই পাইলটিং চার্জও বাড়ানো হয়েছে। এই চার্জ ৩৫৭ ডলার থেকে ৭০০ ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্দরের প্রস্তাবিত ৫৬টি সেবার মধ্যে ১৮ খাতে ৬০ শতাংশেরও বেশি, ১৭ খাতে ২০ থেকে ৫৯ শতাংশ এবং ১৯ খাতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মাত্র দুটি খাতে মাশুল কমানোর প্রস্তাব গেছে। যা ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ১৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি জাহাজের বন্দরে বর্তমান প্রবেশ ফি ৪ হাজার ৩৬২ ডলার। এটি বাড়িয়ে ৬ হাজার ৮৩৪ ডলার নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের চেয়ে মাশুল বেড়েছে ৫৬ শতাংশেরও বেশি। পাইলটিং চার্জের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৬ শতাংশ এবং লোডিং-আনলোডিং চার্জের ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ২০ ফুট কনটেইনারের প্যাকেজ চার্জ ৩ হাজার ৭১৩ থেকে বাড়িয়ে ৯ হাজার ৯০০ টাকা করা হয়েছে। ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে ৪ হাজার ৯৫০ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩ হাজার ২০০ টাকা। আগে ৪০ ফুট হাই-কিউব ও ৪৫ ফুট কনটেইনারে ভিন্ন কোনো চার্জ ছিল না। এ ক্ষেত্রে আদায় করা হতো ৪০ ফুট কনটেইনারের সমপরিমাণ প্যাকেজ চার্জ। নতুন ধার্য করা চার্জে সেটি ৬ হাজার ৬৫০ থেকে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। গ্রাউন্ড রেন্ট চার্জ প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, ৪০ ফুট ও ৪০ হাই-কিউব এবং ৪৫ ফুটের কনটেইনারের জন্য ৭০ টাকা বাড়িয়ে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পণ্য সিএফএস শেডে স্টোর করে রাখার ক্ষেত্রে সাত দিন ফ্রি টাইমের পর প্রতি ঘনমিটার পণ্যের জন্য ১৬ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকা এবং শাটআউট কার্গোর ক্ষেত্রে ফ্রি টাইম ছাড়াই প্রতি ঘনমিটার পণ্যের জন্য ১৬ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্টোরিং চার্জ ৩ টাকা বাড়িয়ে ৬ টাকা এবং রিফার কনটেইনারের প্লাগইন চার্জ ৫০০ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ সময়ের আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার চার্জ বাড়িয়েছে। বন্দর তো লস প্রতিষ্ঠান নয়। প্রতি অর্থবছরে লাভ করছে। এই অবস্থায় চার্জ বাড়ালে বৈশ্বিক জটিল বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। যদি বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল বাড়াতেই চায় তবে ‘অদৃশ্য চার্জ’ আদায় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অদৃশ্য চার্জের নামে আমরা ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর বন্দরকে অর্থ পরিশোধ করে আসছি। এখন অদৃশ্য চার্জও দেব, আবার নতুন ধার্য করা দৃশ্যমান চড়া মাশুল বা চার্জও পরিশোধ করব। দুই ধরনের চার্জ পরিশোধ করলে ব্যবসায়ীরা সর্বস্বান্ত হয়ে যবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ সময়ের আলোকে বলেন, মাশুল বা বাড়তি চার্জ আমরা আগে থেকে দিয়ে যাচ্ছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাশুল বাড়ানোর দরকার ছিল না। মাশুল যদি বাড়াতেই হয় বিদ্যমান ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ ভাগ বাড়ানো যায়। আমরা মাশুল কমানোর দাবি জানিয়েছিলাম বৈঠক করে। কিন্তু বৈঠকের ভালো কোনো ফলাফল পাইনি। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছি মাশুল কমাতে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, আইসিডিগুলোতে আয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও সঠিক নয়। আয় বাড়েনি বরং আগের চেয়ে কমেছে। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি ও যন্ত্রপাতির ব্যয় বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে মাশুল বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। আইসিডিতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়তি চার্জ আদায় কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, গেল ৩১ জুলাই বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাড়তি শুল্ক কমিয়ে নতুন শুল্ক হার নির্ধারণের পর পোশাক রফতানিকারকদের মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি। আবার স্বস্তির মাসেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সব ধরনের মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪০ বছর পর এক সঙ্গে ব্যাপক হারে মাশুল বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
এমএইচ