একযোগে সব হলে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়া একাংশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে ছাত্রদলসহ অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর একাংশ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের কথা জানিয়েছে ঢাবি প্রশাসন। এমন প্রেক্ষাপটে এলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র রাজনীতি’ বন্ধের কোনো চেষ্টা হচ্ছে কি না; সেই প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য বলছে, ‘হল পর্যায়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত’ থাকবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর দিক থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। কয়েকটি সংগঠন পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘নিজস্ব দলীয় স্বার্থে’ আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেছে।
রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ বিশ্লেষকদের কাছেও। এ নিয়ে তারা সংশয়ী। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতি প্রাপ্ত বয়স্কদের অধিকার। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ক্ষুণ্ন করাটা প্রশাসনের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। দলীয় লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করাটা যদি উদ্দেশ্য হয়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদে আলোচনা হতে পারে। হুট করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, ছাত্র রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এর বিরুদ্ধে সাধারণভাবে ক্ষোভ আছে এবং এখন সেটিকেই ব্যবহারের চেষ্টা আছে কোনো কোনো সংগঠনের মধ্যে। আবার কেউ বলছেন, ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘গুপ্ত ও প্রকাশ্য’ সংগঠনগুলোর মধ্যকার অঘোষিত প্রতিযোগিতার কারণেই ছাত্র রাজনীতির ইস্যুটিকে সামনে আনা হচ্ছে। বর্তমান প্রশাসন কর্তৃক গঠিত ডাকসুর আচরণবিধি প্রণয়ন ও সংশোধন বিষয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। তার মতে, ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখেই এখন নানা ইস্যু উঠে আসছে। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, ছাত্র রাজনীতির ইস্যু সামনে এনে কর্তৃপক্ষ ‘কোনো কোনো সংগঠনকে’ বিশেষ সুবিধা দিতে চাইছে বলে মনে করছেন।
ঢাবির ১৮টি হলে ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপরই ওই কমিটি নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদে ও হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মধ্যরাতে ছাত্রদের বিভিন্ন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে বলে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। পরে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে।
শনিবার প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকেও হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সব ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই হলে দলীয় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হবে। এরই মধ্যে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ বিষয় আলোচনা শুরু করেছে প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রভোস্ট ড. ফারুক শাহ বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রোডম্যাপ তৈরি হবে। হলগুলোকে শিক্ষাবান্ধব ও রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ঢাবির আবাসিক হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে। গত বছরের ১৭ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
আসলে দলভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির মানেই যেন ক্যাম্পাসে পেশিশক্তির মহড়া, ক্ষমতাসীনদের টিকিয়ে রাখতে জোর করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধ্য করা, হলের ভয়ংকর গেস্ট-রুম প্রথার মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ, ফাও খাওয়া, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ইত্যাদি কাজে জড়িয়ে পড়া। ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে ছাত্রদের ভ্যানগার্ড থাকার পরিবর্তে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্তে নতুন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাবি শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ রিফাত বিবিসি বাংলাকে বলছেন, হলের রাজনীতি নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই অনেকের ক্ষোভ আছে এবং কারণেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের কমিটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিপরীতে হলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ঘোষণাকে ‘অপরিণামদর্শী ও চটকদার’ আখ্যায়িত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমোল্লার বসু বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যারা প্রকাশ্য রাজনীতি করে তাদের নেতিবাচকভাবে আর যারা গুপ্ত রাজনীতি করে তাদের ইতিবাচকভাবে দেখানো হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বা ফ্যাকাল্টিতে রাজনীতি না করে আমরা কি সচিবালয়ে গিয়ে রাজনীতি করব?’
প্রসঙ্গত, গত বছর ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি ক্যাম্পাসে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, যাদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আন্দোলনের জন্য আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলছেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালানোর অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার জন্যই তো আন্দোলন হয়েছে।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন হবে। সেখানে ছাত্রদলের প্রতি ঈর্ষান্বিত মনোভাব থেকেই কতিপয় রাজনৈতিক দল মব তৈরি করে এ ঘটনা (শুক্রবারের বিক্ষোভ) ঘটিয়েছে। কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে হলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী হবে। যারা খোলস ছেড়ে বের হতে পারে না তারা এবং লুকিয়ে থাকা ছাত্রলীগ-দুই পক্ষই এর পেছনে আছে।
অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে আন্দোলনের পেছনে শিবিরের ইন্ধন থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার অভিযোগ, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ইন্ধন আছে এর পেছনে। আর গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আবদুল কাদের বলছেন, তাদের অনেকে নিজেদের মতো করে ওই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, কিন্তু সাংগঠনিকভাবে তারা অংশ নেননি। তার মতে, এখন কেউ মব তৈরি করে বলছে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি থাকবে না, আবার কেউ বলছে হলে থাকবে না। ‘নানা জায়গায় শিবিরের লোকজনকেই রাজনীতি বন্ধের কথা বলতে শোনা যায়। আবার পরে সেখানে তাদের কমিটিতেও দেখা যায়,’ বলেন তিনি।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ছাত্র আন্দোলনের ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল ওয়ান ইলেভেনের সরকারের বিরুদ্ধে। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সেই সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে। এর বাইরে বলা যায় ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সবশেষ হাসিনা পতনের আন্দোলনের কথা। সবখানেই শিক্ষার্থীদের অগ্রগণ্য ভূমিকা থাকলেও এসব আন্দোলনের কোনোটাই দলীয় ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে হয়নি। উল্টো নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ সেসব ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমন করার জন্য বারবার সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের যেন একটা অবমাননাকর দাসত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। পরীক্ষার আগের রাতেও জোর করে গেস্ট-রুম করানো, গেস্ট-রুম, মিছিল-মিটিংয়ে যোগ না দিলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে হল থেকে বের করে দেওয়া, এমনকি নেতা-নেত্রীদের সালাম দিতে ভুলে গেলেও অকথ্য গালাগাল কিংবা চড়থাপ্পড় দেওয়া হতো। সাধারণ ছাত্রদের গালে-মুখে শুধু চড়থাপ্পড় মেরেই ক্ষান্ত হতো না। মন চাইলে ক্যাম্পাসজুড়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠত। প্রায়ই দুই গ্রুপের মধ্যে হল দখলের রক্তক্ষয়ী লড়াই দেখা যেত। সেই লড়াইয়ে নেতাকর্মীদের হাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র যেমন-রামদা, চাপাতি, হাসুয়া, রড, হকিস্টিক দেখা যেত। কারও কারও হাতে রিভলবার কিংবা পিস্তল। সেসব সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশত কিংবা তারও বেশি শিক্ষার্থী মারাত্মক আহত ও জখম হতো। কেউ কেউ নির্মমভাবে মারাও পড়ত।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান তো দেশের মানুষের চোখে আর একবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি এখন আর দেশের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং তা অভিশাপ। বিশেষজ্ঞরা বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন দেশের প্রচলিত লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রতিটি ক্যাম্পাসের ছাত্র সংসদ সক্রিয় করতে যাতে ছাত্ররা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়ে সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, আমরা গত বছরের ১৭ জুলাই সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসন থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি নিতে সক্ষম হয়েছি যে, হলে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি (ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির, বাগদাস, বামপন্থি ইত্যাদি) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত এক বছরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের এই চুক্তি বলবৎ ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে কয়েকটি সংগঠন গুপ্তভাবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যার কারণে ৮ আগস্ট ছাত্রদল হলে কমিটি ঘোষণা করেছে। আমরা শিক্ষার্থীরা মনে করি, তাদের এসব কার্যকলাপ জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া উল্লেখিত চুক্তিকে ভঙ্গ করেছে, যা স্পষ্টত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
এদিকে অন্যদের বাধা দিলেও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ‘দেদার’ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা আবদুল কাদের। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, শৃঙ্খলা কমিটি কিংবা ব্যাচ প্রতিনিধির নামে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা হলগুলোতে ছায়া প্রশাসন জারি রেখেছেন। কাদেরের অভিযোগ, হলের শৃঙ্খলা কমিটির অধিকাংশই ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত। তারা অনলাইন ভোটাভুটিতে কারচুপি করে এসব প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এসএম ফরহাদ বলছেন, এগুলো তাদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটা রাজনীতি। ছাত্রদলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য চাইলেও এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান। আর আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রম নেই বলে দাবি করে সংগঠনটির ঢাবি শাখার সভাপতি এসএম ফরহাদ বলেন, হলে কেবল সেবামূলক কর্মসূচিই পরিচালিত হয়। বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর হলভিত্তিক কমিটি নিয়ে আগে কোনো আপত্তি ওঠেনি, অথচ বর্তমানে অন্য দলের কমিটি নিয়ে বিরোধিতা করা হচ্ছে এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘শিবির দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হলে রাজনীতি না হোক। আমরা চাই, হলের বাইরে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় রাজনীতি করুক। অথচ বাম সংগঠনগুলো হলে কমিটি গঠন করলেও কেউ প্রশ্ন তোলে না, এখন কেন?’ এসএম ফরহাদ বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে শিবির হলে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। সংগঠনের অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মসূচি টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রধান স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফ সময়ের আলোকে বলেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পুরো আইডিয়াটা একটু ভালো করে পর্যালোচনা করতে হবে। রাজনীতি কখনো নিষিদ্ধ করা যায় না। এখানে বলা হচ্ছে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংগঠন যেন কোনো লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি না করে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক যেকোনো ক্যাম্পাসে তাদের যে অধিকারগুলো সেটি তার বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক হোক বা দেশের নাগরিকতা সংক্রান্ত বিষয়ে হতে পারে এগুলো বিষয়ে সে সংগঠিত হতে পারে। সেখানে সে প্রতিবাদ করতে পারে, সবাইকে সচেতন করতে পারে। এগুলোই তো রাজনীতি। এগুলো বন্ধ করার কোনো বিষয় না। এগুলো বন্ধ করার কোনো মানে হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের দাবি কিন্তু সেটি না। তাদের দাবি লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করা। অর্থাৎ আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর মূল রাজনৈতিক সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়া সেটিই আপত্তির জায়গা। আর এই সংগঠনগুলোই ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করে; যা আসলে সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য আশঙ্কার জায়গা।
এদিকে রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলছেন, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে ছাত্ররা তো আগেও রাজনীতি করেছে, এটি তো নতুন কিছু না। আরেক অংশ নানাভাবে বলছে, ছাত্র রাজনীতিই চলবে না। এখন প্রাপ্ত বয়স্কদের রাজনীতি করার অধিকার তো সাংবিধানিক অধিকার। এখন হুট করে ছাত্রদের একাংশ দাবি করলেই তো আর তা নিষিদ্ধ করা যায় না। এখন হলভিত্তিক রাজনীতি কিংবা লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ চাইলে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, আগে যেমন পরিবেশ পরিষদ ছিল এমন বিষয়গুলো আলোচনার জন্য।
আলতাফ পারভেজের মতে, নিষিদ্ধ করে তো কারও রাজনীতি থামানো যায় না। তিনি বলেন, সবমিলিয়ে নিষিদ্ধের চিন্তাকে আমি টেকসই কিংবা সংবিধানসম্মত মনে করি না। সংবিধানের দেওয়া চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা তো আমরা কেড়ে নিতে পারি না। ছাত্রদল তাদের কমিটি ঘোষণা করেছে হলে, এটি করে তারা কোনো অন্যায় করেছে বলে তো মনে করি না।ৎ এখন শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে, ছাত্রদলের এটি করা ঠিক হয়নি, তা হলে পরিবেশ পরিষদে আলোচনা-বিতর্কের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হতে পারে। কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী দাবি করল আর সেই অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা হলো, এটি তো ঠিক হয়নি। এখন দলীয় লেজুরবৃত্তির রাজনীতির যদি অবসানই চাই, তো সেটি পরিবেশ পরিষদে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
এমএইচ