রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র জুয়েলারি দোকানের আড়ালে অবাধে চলছে স্বর্ণ বন্ধকের নামে অবৈধ সুদের ব্যবসা। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, বায়তুল মোকাররম ও মৌচাক মার্কেট থেকে শুরু করে অভিজাত গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ প্রায় সব এলাকাতেই বন্ধক-ব্যবসা রমরমা। রাজধানীর বাইরেও দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই এই বেআইনি ব্যবসা চালু রয়েছে। আর এর বলি হচ্ছে হাজারো অসহায় দরিদ্র মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তবে এই খাত থেকে চড়া হারে সুদ আদায় করা হয়, মাসিক ১০ শতাংশ পর্যন্ত। চক্রবৃদ্ধি হারের এ সুদ বেড়ে গ্রাহকদের এমন এক চাপে ফেলে দেয়, যাতে সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বহু মানুষ হারায় তাদের সহায়-সম্পদ। তথ্যমতে, গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্যারেট বিবেচনা করে দ্বিগুণ স্বর্ণ বন্ধক রেখে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। এর জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে দোকানিরা বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তাদের কার্ড দেয়।
এ বিষয়ে তাঁতীবাজারের দামিনী জুয়েলার্সের জয়ন্ত ঘোষ বলেন, আমাদের দোকানে স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদে টাকা দেওয়া হয়। আমরা লাখে ৪ শতাংশ সুদ নিই। সময় ভেদে সুদ কমবেশি হয়।
একই মার্কেটের খাজা জুয়েলার্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দোকান মালিক বলেন, আমরা স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদে টাকা দিই। এ সময় তাদের কাছ থেকে স্বর্ণ নিয়ে একটি কার্ড দিই। তাদের সিরিয়াল নাম্বার থাকে, কোড নাম্বার থাকে। ৩-৪ ধরনের খাতায় তাদের তথ্য লিখে রাখা হয়। মাসে মাসে তারা টাকা দেয়। তারা মাসের সুদ মাসে দিয়ে যেতে পারলে যতদিন খুশি স্বর্ণ বন্ধক রাখতে পারে, টাকা রাখতে পরে। একটানা তিন মাস সুদের টাকা দিতে না পারলে আমরা গ্রাহকদের জানাই। তারপর বিবেচনা করে স্বর্ণ ভাঙি।
মৌচাক মার্কেটের দোতলার পর্ণা জুয়েলার্সের অয়ন বলেন, স্বর্ণ বন্ধক নিয়ে স্বর্ণের ক্যারেট হিসাব করে লাখে ৪ শতাংশ হারে সুদে ঋণ দিই। একই মার্কেট থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউ স্টার জুয়েলার্সের এক স্টাফ বলেন, ক্যারেট বিবেচনা করে আমরা টাকা দিই। এটা ক্ষেত্রবিশেষে স্বর্ণের বাজারের দামের ওপর ওঠানামা করে। সাধারণত অর্ধেক দাম দেওয়া হয়। কারণ আমাদের হাতে কিছু টাকা রাখতে হয়। আর সুদ নিই ৩ থেকে ৪ শতাংশ হারে। এটা লাখে হিসাব হয়।
দায়ে পড়ে অনেকের মতো মৌচাক জুয়েলারি মার্কেটে স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদে ঋণ নেন সুহাইল আহমেদ। তিনি বলেন, আমার ছোট একটা ব্যবসা আছে। ব্যবসাটা আরেকটু বড় করার জন্য টাকা প্রয়োজন। কাছে নগদ টাকা না থাকায় স্ত্রীর স্বর্ণের চেইন ও আংটি বন্ধক রাখতে এসেছি। এগুলো ২১ ক্যারেটের স্বর্ণ। কিন্তু তারা অর্ধেকেরও কম টাকা দিতে চায়। এখনও স্বর্ণ বন্ধক রাখিনি। যেখানে একটু বেশি দাম পাব সেখানে রাখব। দুটি দোকানে আমার কাছে ৪ শতাংশ হারে সুদ চেয়েছে।
স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নিতে কী কী কাগজ জমা দিতে হবে বললে তিনি বলেন, তারা ভোটার আইডি কার্ডের সঙ্গে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স আর ঠিকানার প্রমাণপত্র চেয়েছে।
তাঁতীবাজার থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদে টাকা নিয়েছি। এখন সুদ দিতে কষ্ট হচ্ছে। স্বর্ণের দোকান থেকে ফোন দিয়েছিল তাই দেখা করতে এসেছি।
১৯৮৭ সালের ভোগ্যপণ্য আইনে স্বর্ণের ব্যবসার লাইসেন্সের কথা বলা থাকলেও, তাতে বন্ধক বা সুদে টাকা দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু আইন না মেনে অবৈধভাবে বন্ধক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বহু প্রতিষ্ঠান।
স্বর্ণ বন্ধক ব্যবসার বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ বলেন, স্বর্ণের ব্যবসা করার জন্য আমাদের অফিস থেকে ডিলিং লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে স্বর্ণ বন্ধক নিয়ে সুদের ব্যবসার জন্য কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয় না। যথাযথ তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
এ সময় জেলা প্রশাসক সবাইকে তথ্য দিয়ে জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানান।
এমএইচ