সংকট কাটিয়ে উঠছে দেশের ব্যাংকিং খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রথম পাতা

মো. ওমর ফারুক খান। দায়িত্ব পালন করছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। ১৯৮৬ সালে শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকটিতে কর্মজীবন

2025-08-17T11:43:30+00:00
2025-08-17T11:43:30+00:00
 
  সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
প্রথম পাতা
সংকট কাটিয়ে উঠছে দেশের ব্যাংকিং খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫, ১১:৪৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি

মো. ওমর ফারুক খান। দায়িত্ব পালন করছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। ১৯৮৬ সালে শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকটিতে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ব্যাংকিং খাতে তার রয়েছে দীর্ঘ ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতা। দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের অবস্থা, ইসলামী ব্যাংকের সফলতার কারণ, আগামীর চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক সময়ের আলোর সঙ্গে। বর্তমান ব্যাংকিং খাতের অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

দীর্ঘদিন আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ফলে দেশের ব্যাংক খাত একসময় কার্যত একটি খোলসে পরিণত হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ খাতের খেলাপি ও খারাপ ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসে। ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির তথ্য উদঘাটনের পর একাধিক ব্যাংক গুরুতর তারল্য সংকটে পড়ে এবং মূলধন ঘাটতিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত হয়। ব্যাংক খাতের অবস্থা মূল্যায়নে মূলধন পর্যাপ্ততা, মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার সূচকগুলো সামনে আসে। ২০২৪ সালের শেষে ছয়টি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকসহ মোট ১৯টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়ে যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। একই সময়ে ব্যাংক খাতজুড়ে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত নেমে আসে মাত্র ৩.০৮ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ অনুসারে ন্যূনতম থাকা উচিত ১০ শতাংশ। এর সঙ্গে কিছু ব্যাংক তারল্য ঘাটতির সমস্যাতেও ভুগছিল। তবে, সার্বিক এই বিপর্যয়ের মাঝেও আশা জাগানো পরিবর্তন শুরু হয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচিসহ সময়োপযোগী নীতি সহায়তাসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার।

ব্যাংক খাতের দুরবস্থার জন্য আপনি একজন এমডি হিসেবে কাকে দায়ী করবেন?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ব্যাংক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ বা দুরবস্থার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা সঠিক নয়। এটি একটি সমষ্টিগত সমস্যা, যেখানে একাধিক পক্ষের ভূমিকা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শিথিল নীতি, ঋণ প্রদানে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ আদায়ে গাফিলতি এবং দুর্বল নজরদারি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তবে আমি দোষারোপের পরিবর্তে সমাধানে বিশ্বাসী। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, স্বচ্ছতা, সুশাসন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে আবারও শক্তিশালী ও টেকসই করা সম্ভব। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা।

গ্রাহকসেবায় আপনাদের ব্যাংকের সুনাম রয়েছে, আগামীতেও এই সুনাম অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব কি?

গ্রাহকসেবায় ইসলামী ব্যাংকের সুনাম সুদীর্ঘ ৪২ বছরের ঐতিহ্য। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সুদমুক্ত লেনদেন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের গ্রাহকদের মধ্যে দৃঢ় আস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। আর্থিক লেনদেনে শরিয়াহভিত্তিক নীতিমালা অনুসরণ করায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। ইসলামী ব্যাংক মানেই সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা এই বিশ্বাস গ্রাহকদের মনে একটি স্থায়ী ইতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে। ফলস্বরূপ, বর্তমানে এটি দেশের সর্বাধিক আমানতধারী ব্যাংক, সর্বোচ্চ গ্রাহকসংখ্যা, বিনিয়োগ বিতরণ এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রেও শীর্ষস্থান অধিকার করে আছে। দেশের সর্ববৃহৎ নেটওয়ার্ক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে ৪০০টি শাখা, ২৭১টি উপশাখা, ২৭৮৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ২৯৯৪টি এটিএম ও সিআরএম মেশিন। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষও সহজে ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংক অগ্রগামী। ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ সেলফিন-এর ব্যবহারকারী ইতিমধ্যেই ৫০ লাখের ঘর ছাড়িয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রাহকদের জন্য নতুন নতুন সেবা চা

গ্রাহকসেবার মান বাড়াতে আপনাদের আগামী দিনের কোনো উদ্যোগ আছে কি?

গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংক সবসময়ই অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে আসছে এবং আগামীতেও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আমরা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছি, যাতে গ্রাহকরা যেকোনো স্থান থেকে দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন। ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘সেলফিন’ ও আইব্যাংকিং-এ নতুন ফিচার সংযোজন, অনলাইন সেবার পরিধি বৃদ্ধি, গ্রাহক সহায়তা কেন্দ্রের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং স্বল্প পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সেবা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, শাখা ও উপশাখায় গ্রাহকসেবায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাদারত্ব ও সেবার মান উন্নত করা হবে। গ্রাহকদের মতামত ও চাহিদা অনুযায়ী নতুন সেবা প্রবর্তনের মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক, সহজলভ্য ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আপনার দৃষ্টিতে ব্যাংকিং খাতের মূল চ্যালেঞ্জ কী? আর সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন?

আমার মতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের অভাব এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দক্ষ জনবল সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। এসব কারণ শুধু খাতটির স্থিতিশীলতাকেই নয়, গ্রাহকের আস্থাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রথমেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ক্রেডিট মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিটি নৈতিকতা ও পেশাদারত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যেমন-বাসেল-৩ অনুসরণ করা জরুরি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি কমানো, পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণেও জোর দিতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্বচ্ছতা, যোগাযোগ এবং সেবার মান উন্নয়ন এই তিনটি দিক সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য আপনাদের কোনো পরামর্শ আছে কি?

দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। আমি তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার পরামর্শ হবে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সর্বদা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করুন, যাতে আপনার উপার্জিত অর্থ নিরাপদে ও দ্রুত দেশে পৌঁছায় এবং আপনি সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা সুবিধাও পান। প্রবাসে অবস্থানকালে নিজের আয়ের একটি অংশ সঞ্চয়ে রাখুন এবং তা এমন খাতে বিনিয়োগ করুন যা দীর্ঘমেয়াদে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক অফার বা অননুমোদিত এজেন্টের প্রলোভনে পড়বেন না। মনে রাখবেন আপনার কষ্টার্জিত প্রতিটি টাকা শুধু আপনার পরিবারের নয়, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিরও ভিত্তি।


এএডি/



Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: