ঢাকার অদূরে কেরাণীগঞ্জে বেড়েছে অপরাধ। বুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসে আসছে একের পর এক লাশ। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক বস্তাবন্দি ও খণ্ডিত লাশ, যার সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রিপল মার্ডারের লোমহর্ষক ঘটনা। পাশাপাশি, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে বেড়েছে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা, যা কেরাণীগঞ্জকে ক্রমেই ‘ডেঞ্জার জোন’-এ পরিণত করছে।
তথ্য মতে, গেলো ৬ মাসে অন্তত ৩৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কেরাণীগঞ্জে একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ছয় মাসে বিভিন্ন সড়কের পাশ থেকে ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে উদ্ধার হয়েছে অন্তত ৩৫টি লাশ। এর মধ্যে কোনোটি খণ্ডিত, কোনোটি গুলিবিদ্ধ, আবার কোনো লাশের হাত-পা কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত শনিবার (১৬ আগস্ট) তালাবদ্ধ ঘর থেকে রাকিবুল ইসলাম (১৪) নামে এক কিশোরের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে ৪ আগস্ট আলফা বলপেন কারখানার গলিতে পাওয়া যায় অটোরিকশা চালক সাইদুল ইসলামের মরদেহ। ৮ জুলাই ঝিলমিল আবাসিক এলাকার পাশে খুন হন কুয়েত প্রবাসী তাজুল ইসলাম। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশের একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার হয় শামীম নামের এক যুবকের লাশ।
হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ড ও লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলো ভেঙে পড়েছে। থামছে না তাদের আহাজারি। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তারা চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের ওপর একের পর এক হামলা, হত্যা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। গত আড়াই মাসে অন্তত পাঁচজন চালককে খুন করে অটোরিকশা ছিনতাই করা হয়েছে, যা স্থানীয় চালকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামা এই মানুষগুলোর নিরাপত্তার বিষয় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কাজ বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অটোরিকশার যাত্রী সেজে বা অনুসরণ করে নির্জন স্থানে চালককে হত্যা করে গাড়ি ছিনতাই করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঘটনায় রুবেল হোসেনের মতো একজন চালক ছিনতাই ঠেকাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পাশ দিয়ে পথচারীরা হেঁটে গেলেও কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি।
রাজউকের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প এলাকায় রাত নামলেই ভয় ছড়িয়ে পড়ে পথচারীদের মাঝে। ছিনতাই আর হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাই এখন এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা। ফলে কর্মস্থল শেষে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে সাধারণ চাকুরিজীবীদের।
চাকুরিজীবী আশিকুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, “প্রায়ই এখানে ছিনতাই হয়, খুন হয়। এই পথে অনেক ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করি। মাঝে মাঝে সিএনজিতেও উঠতে ভয় পাই। কারণ সিএনজিতে উঠার পর এই স্থানে এসে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। রাতে সড়কবাতি বন্ধ থাকায় অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে পড়েছে। অন্ধকারে চলাচল করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে সড়কবাতি থাকলে চলাচল সহজ হবে এবং অপরাধ কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা সম্ভব।’’
তিনি আরও জানান, “অনেক সময় এখানে পুলিশ থাকে, আবার অনেক সময় থাকে না। তবে প্রিয় প্রাঙ্গণের ওই অংশের সড়কে ছিনতাই বেশি হয়। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ধ্যা নামার আগেই রাস্তা বন্ধ করে দেয়।”
দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের শুভাঢ্যা শ্মশান ঘাট ব্রিজের পরেই অবস্থিত একটি জুয়েলারি বক্স কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন। দিন-রাত চলা এই কারখানার কর্মীদের যাতায়াত এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
কারখানার মালিক মো. মিঠুন মিয়া বলেন, “রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় সবসময় ভয়ে থাকি। গত মাসে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে এখান থেকে দুই রিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুধু তাই নয়, দিনের বেলাতেও এখানে অটোরিকশা ছিনতাই হয়। আগে এখানে পুলিশ র্যাবের টহল থাকলেও এখন তা চোখে পরে না”
স্থানীয়রা বলছেন, রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই উপজেলা শিল্প-বাণিজ্যিক অঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষজন বসবাস করেন। বর্তমানে হত্যা ও ছিনতাইয়ের নগরে পরিণত হয়েছে। ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ঘটছে হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্যে অটোরিকশা থামিয়ে ছিনতাই, অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই ঘটছে অহরহ। ছিনতাইকারীদের অস্ত্রের আঘাতে ঝরছে প্রাণ, অনেকে হচ্ছেন আহত। চুরি-ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সংঘর্ষের মতো অপরাধের হার তুলনামূলক অনেক বেড়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, কেরানীগঞ্জ এলাকায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া যুবকদের মধ্যে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের সংখ্যাই বেশি। তাদের একটি বড় অংশ মৌসুমি বেকার হয়ে পড়ায় সহজেই অপরাধের পথে চলে যাচ্ছে। অনেক সময় তারা খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তবে আমরা প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখে জড়িতদের শনাক্ত করছি এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসছি।”
কেরাণীগঞ্জে একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তৎপর হয়েছে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় চলমান অভিযানে গত ৬ মাসে গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ৪৪৫ জন।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র ও ছিনতাইকারী দলের সক্রিয় সদস্য। এ ছাড়া হত্যা মামলারও একাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কেরাণীগঞ্জে মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যার মতো অপরাধ ঠেকাতে পুলিশি নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয়রা ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে সড়কবাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি তুলেছেন।
এলাকাবাসীর মতে, রাত নামলেই অন্ধকারে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সড়কবাতি থাকলে চলাচল সহজ হবে এবং অপরাধ কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। পুলিশি টহল এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে সাধারণ মানুষ রাতে ভয়মুক্তভাবে চলাচল করতে পারবেন।
সময়ের আলো/এসটিও