বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ২০০১-৬ মেয়াদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সিরাজগঞ্জ-২-এর একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফিসময়ের আলো : আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে ফ্যাসিস্ট হয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা আছে কি?টুকু : আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক নয়। আওয়ামী লীগের প্রধান সমস্যা হলোÑতারা মূলত ফ্যাসিস্ট দল। ক্ষমতায় গেলে তারা অন্যায় করে। গত ১৬ বছর তারা নিজেদের সেক্যুলার আখ্যা দিয়ে ভারতসহ বিদেশি শক্তির সমর্থনে অত্যাচার করেছে। সবাই তাদের সমর্থন করেছে। কিন্তু বিএনপি এই দল না। বিএনপির ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে ফ্যাসিস্ট হওয়ার চরিত্র আমাদের নেই। আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় কি ফেসবুক, ইউটিউব ছিল? কিচ্ছু ছিল না। এখন পৃথিবী উন্মুক্ত। কোনো সরকারের পক্ষে ফ্যাসিস্ট হওয়া কঠিন। জনগণ অসন্তোষ হলে তারা রাস্তায় নেমে যাবে। বিএনপি মধ্যপন্থি দল, পরিস্থিতিই আমাদের আওয়ামী লীগের মতো হতে দেবে না।
বিএনপি নেতারা বলছেন কেউ কেউ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে।নির্বাচন বিঘ্নিত করার জন্য দেশে অনেক অগণতান্ত্রিক শক্তি আছে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এটা খুব চিহ্নিত শক্তি। তারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে। তারা প্রার্থী ঘোষণা করেছে, কিন্তু বিএনপি এখনও করেনি। এই দ্বৈত মানদণ্ড তারা আগেও দেখিয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথে হাঁটার বাধাপ্রাপ্ত করার জন্য এই দলটি চেষ্টা করবে। কিন্তু এই চেষ্টা আমাদের প্রতিহত করতে হবে।
নির্বাচন আদায়ে আবারও বিএনপির রাজপথে আন্দোলনের প্রয়োজন আছে কি?আমি আন্দোলনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। ড. ইউনূস নির্বাচনি রোডম্যাপ দিয়েছেন, সারা দেশে নির্বাচনের গাড়ি চালু হয়ে গেছে। জনগণ নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। অনেকে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে।
কয়েকটি রাজনৈতিক দল বলছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না।আমি ওদের (এনসিপি) বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না সাধারণত। ওদের বয়স আমারও ছিল। ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, তখন তো আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তখন বিপ্লবের চিন্তা মাথায় ঘুরত। এই বয়সে তারাও করছে। জামায়াতের সঙ্গে এখন যারা আছে, তাদের চরিত্র তো সবার জানা। যেমন তারা মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। জনগণ তাদের চেনে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জবাব দেবে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি কোনো সংকট দেখছে?বিএনপি নয়, জাতির জন্য শঙ্কা। একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। বাংলাদেশের একটা মানচিত্র আছে। কেউ ধর্মীয় বন্ধন দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ধর্মীয় বন্ধনের মধ্যে কোনো রাষ্ট্র টিকতে পারে না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—মিডল ইস্ট। সবাই তো মুসলমান। তা হলে এত রাষ্ট্র কেন? তা হলে আমরা কি করে ওই যাদের সঙ্গে আমার ভাষার মিল নেই, রুচির মিল নেই, কথার মিল নেই, কালচারের মিল নেই, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্র হয় কোনোদিন? স্বাভাবিকভাবেই আমি আমার নিজের কালচার, নিজের ভাষা, সব নিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। সেটাকে আবার কেউ যদি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে, আমি তো মনে করি সে রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি ছাড় দেবে?পিআর পদ্ধতি পরীক্ষাগারে পরীক্ষার মতো। আমাদের দেশের মানুষ তাদের জনপ্রতিনিধিকে চিনতে চায়। পিআরে কে এমপি হবে, তা জনগণ জানবে না। আর দুই নম্বর হচ্ছে যে, পরবর্তী সরকারকে দুর্বল করার জন্য এটা করা হয়। এককালে আইয়ুব খান বুনিয়াদি গণতন্ত্র দিয়েছিল, এই বুনিয়াদি গণতন্ত্র আর পিআর একই রকম হবে। বুনিয়াদি গণতন্ত্রে জনগণ ভোট দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান তৈরি করল। এই মেম্বার চেয়ারম্যানরা ভোট দিয়ে পার্লামেন্টের মেম্বার বানাল। সেটা তো থাকেনি। আইয়ুব খান যতদিন ছিল ততদিন চলেছিল। এখন যারা ধর্ম বিস্তার করে দল করছে তারা এটা সমর্থন করছে। ওদের পুরোনো অভ্যাস যায়নি আরকি।
উচ্চ কক্ষে পিআরের কথা বলা হচ্ছে।আপার হাউসে হতে পারে, এটা আমাদের পরিষ্কার বলা আছে। সমাজের অনেক মানুষ আছে যারা সরকারে কন্ট্রিবিউট করতে পারে। তাদের সুযোগ দেওয়ার জন্যই আপার হাউস তৈরি করা।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিএনপির ছাড় দেওয়ার সুযোগ আছে?আমরা যা দেওয়ার, সব দিয়েছি। আমরা একটি গাইডলাইন দিয়েছি। সেটাই অনুসরণ করা হবে।
আপনাদের সঙ্গে প্রায় দুই যুগের একটি জোট ছিল জামায়াতের। এই জোট গঠন কি ভুল ছিল?না, ইলেক্টোরাল ও পলিটিক্যাল অ্যালায়েন্স এক নয়। ইলেক্টোরাল অ্যালায়েন্সে ভোটের সময় ঝামেলা হয়। আর পলিটিক্যাল অ্যালায়েন্সে আধুনিক রাজনীতি থাকে। জামায়াতের যে রাজনীতি সেটার সঙ্গে আমাদের মিল নেই। তাদের সঙ্গে পলিটিক্যাল অ্যালায়েন্স করিনি, ইলেক্টোরাল অ্যালায়েন্স করছিলাম। করে তো আমরা দেখলাম কী হয়েছে। সুতরাং অ্যালায়েন্স ভবিষ্যতে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল কবে হবে?আমরা সারা দেশে সম্মেলন করে কমিটি করছি। কমিটি দেওয়া শেষ হলে কাউন্সিল হবে। আগে হয়নি, কারণ আমরা সবাই দৌড়ের ওপরেই ছিলাম। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা ১৮ বছর আন্দোলন করে নিজেদের টিকেয়ে রেখেছে। তাদের মধ্যে এখন অনেক বেশি প্রত্যাশা। এগুলোকে মিলমিশ করে তারপরে কমিটি করে নিয়ে আসা খুবই কঠিন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে হবে?টাইমফ্রেম নেই। এখন অনেক জিনিস চলছে। নির্বাচনের গাড়ি চালু হয়ে গেছে। আমাদের সংগঠনের রিঅর্গানাইজেশন চলছে। এগুলো মিলিয়ে নির্বাচনের আগে সম্মেলন করার কোনো সুযোগ নেই। সময় খুবই কম। যেসব নেতাকর্মী গত ১৮ বছর কষ্ট করে হাসিনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, জেল খেটেছে, তারা কেবল একটু স্বস্তি পাচ্ছে। তাদের আগে মূল্যায়ন করতে হবে। কমিটি ভেঙে দিলেই তো হবে না। সুতরাং আমাদের অনেক ভেবেচিন্তে আগাতে হচ্ছে।
গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা আছে।আপাতত এগুলো নিয়ে আলোচনা করিনি। তাই বলতে পারব না।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। আপনাদের মনোনয়নের কাজ শুরু হয়েছে?বিএনপির সব কাজ চলমান। তারেক রহমান লন্ডনে বসে থাকলেও প্রত্যেকটা এলাকার খবর রাখেন। উনি প্রত্যেকটা এলাকা থেকে একটি নয়, অনেক রিপোর্ট নেন। নিয়ে সব রিপোর্ট মিলিয়ে তারপর উনি সিদ্ধান্ত নেন।
মিত্রদের আসন দেওয়া হবে। সেখানে দলীয় প্রার্থীদের নিবৃত্ত করা চ্যালেঞ্জ কিনা?বিষয়টি নিয়ে আলাপের এখনও সময় হয়নি। এখনও তফসিল ঘোষণা হয়নি। তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরে আমরা কীভাবে সমন্বয় করব, সেটা তখন ঠিক করা হবে। কিছু জায়গায় কিছু চিঠিও দেওয়া হয়েছে দল থেকে। সেটা এমনি সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়েছে। নমিনেশন দেওয়া হবে তো বলা হয়নি।
নির্বাচনে জয়ী হলে সমমনাদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন। কেমন হতে পারে জাতীয় সরকার?একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে যে, এবার যে সরকার আসবে—হাসিনার সরকার যে পরিমাণে অনিয়ম আর্থিক দুর্নীতি করে গেছে—এগুলো থেকে উত্তরণ করতে হলে বিএনপির একার পক্ষে সম্ভব নয়। গোটা জাতিকে একসঙ্গে নিয়ে অনবোর্ড করে কাজগুলো করতে হবে। সে জন্যই আমরা বলেছি যে একটা জাতীয় সরকার করেই তাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো মোকাবিলা করব।
জাতীয় সরকারে বিরোধী দল থাকবে?সেটা সময় বলবে। আর সবাই যদি জাতীয় সরকারে চলে যায় তা হলে পরে অপজিশনে বসবে কে? পার্লামেন্টে বসবে কে? এগুলো তখনকার পরিস্থিতি বুঝে করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ নিয়ে আপনার সময়ে সমালোচনা ছিল। সামনের পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শ?এক নম্বর হচ্ছে আমার সময়ে আমরা আওয়ামী লীগের মতো ইনডেমনিটি বিল পাস করে অন্যায়ভাবে কিছু করিনি। আমার সময় বিদ্যুতের যত খারাপ কথা বলা হয়েছে, গত ১৮ বছরে বিদ্যুৎ নিয়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমায় কোনো কাজ হয়নি। আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আমার ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল থেকে। সুতরাং আমাদের আমলে যে বিদ্যুতে যে কোনো রকমের দুর্নীতি হয়নি, এটাই প্রমাণ করে। ১৬ বছর আওয়ামী লীগ এই যে খাম্বা খাম্বা, হাম্বা হাম্বা করেছে, খাম্বার বিরুদ্ধে একটা মামলাও দিতে পারছে আজ পর্যন্ত? এখনও আমি ফেসবুকে কোনো স্টেটমেন্ট দিলে জামায়াতি সাইবারা খাম্বা লেখে, তার পরে আওয়ামী লীগ তো লেখেই। তো এগুলো কিছু আসে যায় না। ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারই প্রমাণ করবে যে আমাদের আমলে আমরা এমন কোনো অন্যায় করিনি যার জন্য আমাদের দোষী করতে পারে। আমরা আইন মেনে চলেছি। তবে হ্যাঁ, সামনে জ্বালানি সেক্টর নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে।
সাইবার জগতে বিএনপি পিছিয়ে কেন?আমারা আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রস্তুত করছি। কাজ চলছে।
আপনাকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।আপনাকেও ধন্যবাদ।
আরআর