বান্দরবানের সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা বলা হয় থানচিকে। উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষের একমাত্র ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে হাসপাতালটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পুরো হাসপাতাল চালাচ্ছেন মাত্র একজন চিকিৎসক।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে ১২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। এর মধ্যে একজন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন। ফলে কার্যত একজন চিকিৎসকের ওপর ভরসা করেই চলছে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। অন্যদিকে নার্সের পদে ১৮ জন থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন। মিডওয়াইফ নেই একজনও।
এ প্রসঙ্গে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে মাত্র দুজন চিকিৎসক আছেন। তাদের মধ্যে একজন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকায় কার্যত রোগীদের সেবা দিতে পারছেন না। ফলে হাসপাতালের পুরো দায়িত্ব বর্তমানে একজনকেই সামলাতে হচ্ছে। জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের কারণে গুরুতর রোগীদের রেফার করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু দীর্ঘ পথের কারণে অনেক রোগী সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।
বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, পার্বত্য তিন জেলাতেই চিকিৎসক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নতুন করে ৪৮তম বিসিএসের ডাক্তার পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৮ থেকে ১০ জন চিকিৎসককে বান্দরবানে বদলি করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মংমে মারমা বলেন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের বদলি করা হলেও অনেকেই থানচিতে যোগ দেন না, ডেপুটেশনে থেকে যান জেলা সদর হাসপাতালে। এর ফলে প্রায় ৩০ হাজার স্থানীয় মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রিয়েং ম্রো বলেন, পাহাড়ের অধিকাংশ মানুষ গরিব। জেলা সদর হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল এবং কঠিন। রেমাক্রি, বড় মদক, তিন্দু এলাকার মানুষদের থানচি থেকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে প্রচুর খরচ হয়। এরপর আবার বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার করা হলে সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করবে তা এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়রা জানান, জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী কিংবা অন্তঃসত্ত্বা রোগীদের থানচি হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রায়ই বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। থানচি থেকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক রোগী মাঝপথেই মৃত্যুবরণ করেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত থানচি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৯৮ রোগী। এর মধ্যে ৪৫৬ জনকে রেফার করা হয়েছে বান্দরবান সদর হাসপাতালে। থানচি থেকে বান্দরবান যাওয়ার পথে মারা গেছেন অন্তত সাতজন রোগী। এ ছাড়া বান্দরবানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আরও ১৭ জন রোগী। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও বেশি।
ভুক্তভোগী শৈসাইমং মারমা নামের নয় বছরের এক শিশু জানায়, ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে তার অন্তঃসত্ত্বা মা শৈমেপ্রু মারমাকে থানচি হাসপাতালে আনার পর সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু পথে চিম্বুক এলাকায় মারা যায় তার মা। চার সন্তানের জননী লেংরু ম্রো জানান, তার স্বামী রেং য়ুং ম্রো কিডনি জটিলতায় থানচি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে সেখান থেকে দ্রুত বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যুবরণ করেন তার স্বামী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসক সংকটে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। পাহাড়ি এলাকা থেকে নদীপথ কিংবা দুর্গম সড়ক পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে আসার পরও কাক্সিক্ষত সেবা মেলে না। রোগীকে সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরেই থানচি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটের অভিযোগ তুললেও সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসছে না কেউ।