১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে ভয়াবহ গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। গুলি চালিয়ে একসঙ্গে ১২৭ জনকে হত্যার পর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মরদেহ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এটি হবিগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড। ১২৭ জন শহিদের মধ্যে ৪৫ জনের পরিচয় মিললেও সরকারি তালিকায় নাম উঠেনি কারও। মেলেনি শহিদের স্বীকৃতি।
স্বাধীনতার এত বছর পরও শহিদদের স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ দাস অনুপ বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ আমাকে এ বিষয়ে অবগত করেননি। খোঁজখবর নিয়ে দেখব। তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিবসটি পালন করা হয়। এবারও দিবসটি পালন করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, শহিদদের স্মরণে গ্রামবাসীর উদ্যোগে ৩৪ লাখ টাকা খরচ করে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে ২০১৭ সালে। এর মধ্যে জেলা পরিষদ হতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণপুর গ্রামবাসী শহিদদের স্মরণে বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে থাকেন।
এ বিষয়ে কৃষ্ণপুর কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিটন সূত্রধর বলেন, এবার স্বল্প পরিসরে দিনটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার কৃষ্ণপুর গ্রামবাসীর উদ্যোগে বধ্যভূমিতে শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ, কালো পতাকা উত্তোলন, শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃষ্ণপুর গ্রামটি বৃহত্তর সিলেট জেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ছিল। বর্তমানে গ্রামটি হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার অধীনে রয়েছে। লাখাই থানা থেকে কৃষ্ণপুর গ্রামের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। গ্রামের দক্ষিণ দিকে বলভদ্র নদী বয়ে গেছে যা হবিগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক করেছে। কৃষ্ণপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী অর্থাৎ বলভদ্র নদীর দক্ষিণ পাড়ে চণ্ডীপুর গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। চণ্ডীপুর গ্রামটি আবার ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলায় অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছয় মাস কৃষ্ণপুর গ্রামের লোকজন সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছিলেন। যুদ্ধের আঁচ তাদের গায়ে লাগেনি। হাওড়ের প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণপুর গ্রামে আশপাশের অনেক হিন্দু আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল এই হাওড়ের গ্রামে কোনো দিন পাকিস্তানের সেনা আসবে না। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত হানাদার বাহিনী লাখাই থানায় সুবিধা করতে পারেনি। ১৬ সেপ্টেম্বর রাজাকাররা কৃষ্ণপুর গ্রামে গণহত্যা সংগঠিত করার উদ্দেশ্য অষ্টগ্রাম পাকিস্তানি ক্যাম্পে জড়ো হয়। অষ্টগ্রাম ক্যাম্পে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজাকাররা নৌকা, স্পিডবোট ও লঞ্চ নিয়ে গ্রামটিতে পৌঁছে সারা গ্রাম ঘিরে ফেলে। ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানায় স্থাপিত ক্যাম্প থেকে একটি স্পিডবোট ও ১০-১২টি বড় নৌকায় হানাদার বাহিনীর একটি দল কৃষ্ণপুর গ্রামে আসে। এরপর কৃষ্ণপুর গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
গ্রামে ঢুকে একটি দল নৌকা থেকে নেমেই নির্বিচারে গুলি ছুড়তে শুরু করে ত্রাস সৃষ্টির জন্য। অন্য আরেকটি দল তখন পাহারা দিতে থাকে। গ্রামে ঢুকে রাজাকাররাও গুলি চালাতে থাকে এবং ব্যাপক লুটপাট শুরু করে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৩১ জন হিন্দুকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চক্রাকারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হলে ১২৭ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
প্রিয়তোষ রায়, নবদ্বীপ রায় এবং হরিদাস রায় বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। তারা তিনজনই সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে যান।
এএডি/