বন্যাপ্রবণ উত্তরাঞ্চলে আশার আলো

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা অনেক দিন ধরে এক নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। বছরের পর বছর ধরে বারবার বন্যা, নদীভাঙন

2025-09-30T23:44:52+00:00
2025-09-30T23:44:52+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
বন্যাপ্রবণ উত্তরাঞ্চলে আশার আলো
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১১:৪৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা অনেক দিন ধরে এক নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। বছরের পর বছর ধরে বারবার বন্যা, নদীভাঙন আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। গাইবান্ধা ও বগুড়ার মতো জেলায় যেখানে মাটির উর্বরতা থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে ফসলের ক্ষতি ঘটে প্রায় প্রতি মৌসুমেই, সেখানে কৃষিকাজ হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত এক জীবনসংগ্রাম। এসব এলাকার অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, যারা উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পান না, আবার বাজারে প্রবেশাধিকারও থাকে সীমিত। এ বাস্তবতায় তাদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ‘আইএসসিএইচভি’ বা বিল্ডিং অ্যান ইনক্লুসিভ অ্যান্ড সাসটেইনেবল সাপ্লাই চেইন ফর রেস্পন্সিবিলি প্রোডাক্ট হাইকোয়ালিটি ভেজিটেবল।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুর উপজেলাসহ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় এ আর মালিক সিডস প্রাইভেট লিমিটেড এবং জার্মানির ডিইজি ইমপালসের অর্থায়নে অর্গানাইজেশন অব ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস ফর ডিস্ট্রেসড (ওডিএসডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সংগঠিত করতে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা অবলম্বন। এ ছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ওয়াফেন রিসার্চ ল্যাব, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং সমবায় বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা প্রদান করছে। মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের সংগঠিত করে দায়িত্বশীল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, ফসলোত্তর ক্ষতি হ্রাস করা এবং তাদের উৎপাদিত সবজি সরাসরি লাভজনক বাজারে পৌঁছে দেওয়া। প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে এই যাত্রা শুরু হয়, যাদের অধিকাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছিলেন।

প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অর্জনগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয় বরং কৃষকের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে ২ হাজার ৪০০ দলীয় সভা, যা কৃষকদের ভেতরে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছে। একসময় যারা আধুনিক কৃষি পদ্ধতির নামই শুনতেন না, তারা এখন নিজের জমিতে সেই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করছেন। চার হাজার কৃষকের মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশমালা ও পানি পরীক্ষা করে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, উৎপাদনকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আপদ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কৃষকদের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬০০ ব্যাচে পাঁচ হাজার কৃষককে দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ, যার বিষয় ছিল টেকসই কৃষি, ফসলোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি)। প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকরা শুধু উৎপাদনেই নয়, সংরক্ষণ ও বিপণনেও নতুন কৌশল রপ্ত করেছেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৮০ জন কৃষক গ্লোবাল জিএপি প্রত্যয়ন পেয়েছেন। এটি শুধু একটি সনদ নয় বরং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের দরজা। চলতি বছরের মধ্যেই আরও এক হাজার কৃষককে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের মশালমারা গ্রামের কৃষক মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘আগে আমাদের সবজি কেবল স্থানীয় হাটেই বিক্রি হতো। দামও দিত দালালরা। এখন শুনছি আমাদের ফসল বিদেশেও যেতে পারে। ভাবতেই গর্ব লাগে।’

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রদর্শনী খামার। কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য চারটি উপজেলায় গড়ে তোলা হয়েছে চারটি বড় প্রদর্শনী খামার এবং ৩০০ মিনি খামার। ইতিমধ্যে ৭৫টি প্রদর্শনী সফরে কৃষকরা সরাসরি শিখেছেন কীভাবে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি মাঠে প্রয়োগ করতে হয়। নারী কৃষকরাও এখানে সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নারী কৃষক মিনি বেগম বলেন, ‘প্রশিক্ষণে শিখেছি কীভাবে কম কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। আমাদের সবজি এখন টাটকা থাকে বেশি দিন, আর বাজারে বিক্রিও ভালো হচ্ছে।’

কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে চারটি সমবায়, যার মধ্যে তিনটির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। এসব সমবায় কেবল উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রেই নয়, নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকরা এখন নিজেরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সমষ্টিগতভাবে বাজারে প্রবেশ করছেন।

এই প্রকল্পের প্রতিটি পদক্ষেপ জাতিসংঘঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, জেন্ডার সমতা, দায়িত্বশীল উৎপাদন এবং অংশীদারত্ব, এসব ক্ষেত্রেই সরাসরি অবদান রাখছে আইএসসিএইচভি প্রকল্প। 

নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ প্রকল্পকে করেছে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধি নয়, খাদ্যের অপচয় রোধ ও নিরাপদ সবজি সরবরাহের মাধ্যমে ভোক্তারাও উপকৃত হচ্ছেন।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের বেঙ্গুলিয়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি উৎপাদনে টিকে থাকার লড়াই করে আসছেন। আগে মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়ে যেত। এখন আইএসসিএইচভি প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি নিরাপদ সবজি উৎপাদন করছেন। 

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের তাঁতীপাড়া গ্রামের মরিচ চাষি সাহারুল মিয়ার ভাষায়, ‘আগে দুশ্চিন্তায় দিন কাটত, ফসল টিকবে কি না তা নিয়ে ভয়ে থাকতাম। এখন শিখেছি কীভাবে জমি প্রস্তুত করতে হয়, কীভাবে সঠিক সময়ে সার ও পানি দিতে হয়। আমাদের উৎপাদিত ফসল এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখেছি।’

ওডিএসডি সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং আইএসসিএইচভি প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম গোলাপ বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আইএসসিএইচভি প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয় বরং জীবন পরিবর্তনের গল্প। যারা একসময় মনে করতেন কৃষিকাজ কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তারাই আজ দেখছেন কৃষি হতে পারে নিরাপত্তার, স্বপ্নের, এমনকি বৈশ্বিক বাজারে অংশগ্রহণের হাতিয়ার। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে, তবে এই অঞ্চলের কৃষকরা শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরই হবেন না বরং বাংলাদেশকে নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন সবজি রফতানির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরবেন।’

সময়ের আলো/জেডআই

Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: