ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা ম্যাচের স্কোরকার্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। হয়ে উঠে যুগান্তকারী, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে অনুপ্রেরণার গল্প। পাকিস্তানের বিপক্ষে নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে মারুফা আক্তারের করা সেই ডেলিভারি ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত। নিখুঁত ইন-সুইংয়ে সিদ্রা আমিনের স্টাম্প ভেঙে উড়িয়ে দেওয়া বলটি শুধু একটি উইকেট ছিল না—এটি ছিল স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাফল্যের প্রতীক।
পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের প্রাণভোমরা ছিলেন সিদ্রা আমিন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত সিরিজে তার ব্যাট থেকে এসেছিল টানা তিন ইনিংসে ১২১*, ১২২ এবং ৫০* রান। বাংলাদেশের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিও স্বীকার করেছিলেন, ‘ওই একজনই সবচেয়ে বড় হুমকি।’ কিন্তু সেই সিদ্রাকেই ম্যাচের একেবারে প্রথম ওভারে সাজঘরে ফেরালেন নীলফামারীর মেয়ে মারুফা। প্রথম কয়েকটা বল আঁটোসাঁটো লাইন ধরে রাখার পর নিখুঁত ইন-সুইংয়ে ব্যাট নামানোর আগেই উড়িয়ে দিলেন স্টাম্প। বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস এক লাফে আকাশছোঁয়া, পাকিস্তান যেন হোঁচট খেল শুরুতেই।
এই রূপকথার পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। সৈয়দপুর-নীলফামারীর ঢেলাপীর হাটের কাছে কৃষক বাবার সংসারে বেড়ে ওঠা মারুফার জীবনজুড়ে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারে গরু-মহিষ নেই, তাই চাষের জমি সমান করার জন্য হাল টেনে বাবাকে সাহায্য করতে হয়েছে মারুফাকেই। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, বাবা-মেয়েতে কাদামাখা মাঠে মই টেনে জমি সমান করছেন। অনেকের চোখে জল এনে দিয়েছিল দৃশ্যটি। তবে মারুফা সে সময় বলেছিলেন, ‘এটা তেমন কিছু না, বাবাকে সাহায্য করেছি মাত্র।’
সংসারের টানাপড়েনের মাঝেও ক্রিকেটের স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। ছোটবেলা ফুটবলে মেতে থাকলেও সময়ের সঙ্গে ক্রিকেট হয়ে ওঠে আসক্তি। গ্রামের বড় ভাইদের সঙ্গে খেলা থেকে শুরু করে সৈয়দপুরের স্থানীয় একাডেমিতে হাতেখড়ি। বিকেএসপিতে ট্রায়ালে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে পারেননি ক্লাসের শর্তে। হতাশায় ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার ভাবনাও এসেছিল।
সেসব দুঃসময় পেছনে ফেলে নিজেকে পুড়িয়ে মারুফা আজ বিশ্বমঞ্চে পতাকা উড়াচ্ছেন লাল-সবুজের। নারী বিশ্বকাপের মঞ্চে পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে এমন শুরুর উইকেট শুধু ম্যাচের দৃশ্যপটই পাল্টায়নি, বরং বাংলাদেশের তরুণীদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ যখন এক সিদ্রার ওপর নির্ভর করে ভেঙে পড়ল, তখন বোঝা গেল বাংলাদেশের মেয়েদের বোলিং শক্তি আর মানসিক দৃঢ়তা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মারুফার এই ডেলিভারি যেন বার্তা দিয়েছে—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লড়াই করার শক্তি আছে বাংলাদেশের। শুধু প্রতিভা নয়, আছে ত্যাগ-তিতিক্ষার শক্তিও।
এখনও কেবল ২০ বছর বয়স মারুফার। তবে তার চোখে একটাই স্বপ্ন, ‘বাংলাদেশ নারী দলে খেলে দেশকে জেতাতে চাই।’ ক্ষেতে মই টেনে বাবাকে সাহায্য করা এক মেয়ের হাতে যখন বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিপক্ষের স্টাম্প উড়ে যায়, তখন সেটা কেবল ক্রিকেটের জয় নয়। এটা অভাবের বিরুদ্ধে জয়, স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা পেরিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প। মারুফার সেই ডেলিভারিটি তাই হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার প্রতীক—যা মনে করিয়ে দেবে ম্যাচ শুধু নিখুঁত এক ডেলিভারিই বদলে দিতে পারে না, বদলে দিতে পারে একটা জাতির আশা।
আরআর