গত বছর মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে বেশি আলোচনায় ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। সময় থেমে থাকে না। কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে আরেকটি বছর, দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২৬। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মিলিয়ে বিদায় নিচ্ছে ২০২৫। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এই বছরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে সাফল্যের কারণে নয়; বরং অস্থিরতা, বিতর্ক আর প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার জন্য। মাঠের পারফরম্যান্সে বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার হতাশা যেমন ছিল, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মাঠের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ, যা পুরো বছরজুড়েই ক্রিকেটকে রাখে টালমাটাল অবস্থায়...
ওয়ানডের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক নয় : যে সংস্করণটিকে এতদিন নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী বলে দাবি করে এসেছে বাংলাদেশ, সেই ওয়ানডেতেই সবচেয়ে বড় ভাটা পড়েছে। বছরজুড়ে ১১টি ওয়ানডে খেলে মাত্র ৩টিতে জয় পেয়েছে দল, বিপরীতে হার ৮টি ম্যাচে, এর একটি সুপার ওভারে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, একসময়ের নির্ভরতার জায়গাটিতে কতটা মরিচা ধরেছে।
টি-টোয়েন্টিতে ফিফটি-ফিফটি : ছোট সংস্করণে সাফল্যের গল্প আরও উজ্জ্বল। ব্যস্ত সূচির মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ খেলেছে ৩০টি ম্যাচ। এর মধ্যে ১৫টিতে জয় পেয়েছে লিটন দাসের দল, হেরেছে ১৪টি ম্যাচে। ফলাফলের এই ভারসাম্য দেখাচ্ছে, সীমিত ওভারের ছোট সংস্করণে এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে মাঠের বাইরের অস্থিরতা আর বিতর্কের ভিড়েও মাঠের লড়াইয়ে বাংলাদেশ পুরোপুরি শূন্য হাতে ফেরেনি।
বছরের শুরুতেই বিপিএলের কালোছায়া : ২০২৫ সালের শুরুতেই ধাক্কা খায় দেশের সবচেয়ে বড় ঘরোয়া টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। ১১তম আসরে দুর্নীতির অভিযোগে লিগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিসিবির অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (এসিইউ) সতর্ক হওয়ার পর একে একে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নাম আলোচনায় আসে। দীর্ঘ নয় মাস তদন্ত চালিয়ে একটি বড় প্রতিবেদন তৈরি হলেও তা প্রকাশ না করায় সমালোচনা আরও বাড়ে। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিসির সাবেক দুর্নীতি দমন প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে এনে এসিইউ সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বিসিবি। তার সুপারিশে কয়েকজনকে ভবিষ্যৎ বিপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে এনামুল হক বিজয়, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, সানজামুল ইসলামের মতো জাতীয় ক্রিকেটার রয়েছেন। ‘দুর্বার রাজশাহী’ ও ‘চট্টগ্রাম কিংস’-এর বকেয়া পারিশ্রমিক জটিলতা বিপিএলের ভাবমূর্তিকে আরও নড়বড়ে করে তোলে। শেষ পর্যন্ত বিসিবি নতুন করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়।
বিসিবিতে ক্ষমতার পালাবদলের নাটক : বছরের মাঝামাঝি এসে বিসিবির ভেতরে শুরু হয় আরেক নাটকীয় অধ্যায়। মে মাসে আটজন পরিচালক প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তার পরিচালক পদ বাতিল করলে প্রেসিডেন্ট পদও হারান তিনি। দায়িত্ব নেন সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
অক্টোবরের বিসিবি নির্বাচন : কম ভোটার উপস্থিতি, বয়কট আর সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন ঘিরে। শেষ পর্যন্ত বুলবুল পুনর্নির্বাচিত হন চার বছরের জন্য, আর ফারুক আহমেদ ফিরে আসেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। এই রাজনৈতিক টানাপড়েন বিসিবির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল বিসিবিতে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে পরে সরে দাঁড়ান।
ঘরোয়া ক্রিকেট অচল, ক্রিকেটারদের অনিশ্চয়তা : নির্বাচনের পর বিসিবি ও ঢাকার ক্লাবগুলোর সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্লাবগুলো ঘরোয়া লিগ বয়কট করলে ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আটটি ক্লাব অংশ না নেওয়ায় শত শত ক্রিকেটারের জীবিকা পড়ে অনিশ্চয়তায়। দেশের ক্রিকেটের ভিত্তি বলে পরিচিত ঘরোয়া কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
নারী ক্রিকেটে ভয়ংকর অভিযোগ : ২০২৫ সালে নারী ক্রিকেটেও নেমে আসে অস্বস্তিকর ছায়া। নভেম্বরে সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম অভিযোগ করেন, ২০২২ ওয়ানডে বিশ্বকাপ চলাকালে সাবেক সিলেক্টর ও টিম ম্যানেজারসহ কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি অশোভন আচরণের শিকার হন। অযাচিত স্পর্শ ও ব্যক্তিগত প্রশ্নের অভিযোগে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। একই সঙ্গে অধিনায়ক নিগার সুলতানার বিরুদ্ধেও ওঠে জুনিয়র খেলোয়াড়দের মারধরের অভিযোগ। বিসিবি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেছাতে পেছাতে গড়ায় ২০২৬ সাল পর্যন্ত।
শাস্তি, অধিনায়কত্ব ও মনোবল ভাঙার গল্প : ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আম্পায়ারের সঙ্গে অসদাচরণে তাওহীদ হৃদয়ের শাস্তি, ফাইনাল মিসÑসব মিলিয়ে বিতর্কের আরেক অধ্যায়। অন্যদিকে নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে বোর্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। শ্রীলঙ্কা সফরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ শান্ত টেস্ট অধিনায়কত্বও ছাড়েন। পরে আলোচনা শেষে আবার টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে ফেরেন, কিন্তু ক্ষত থেকে যায়। নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি দলে শামীম হোসেনকে নিয়ে লিটন দাস ও নির্বাচকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসাও বছরজুড়ে অস্থিরতার আরেক নজির।
প্রশ্নবিদ্ধ এক বছর, অজানা আগামী : সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ছিল অর্জনের চেয়ে বিতর্কে ভরা এক অধ্যায়। মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে বোর্ডরুমের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব আর নৈতিক প্রশ্নই বেশি আলোচনায় এসেছে। নতুন বছর শুরুর প্রাক্কালে প্রশ্ন একটাইÑকবে শান্ত হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট? কবে মাঠের পারফরম্যান্সই হয়ে উঠবে প্রধান আলোচনার বিষয়?
এএডি/