দেশ বদলায়, ক্রিকেট নয়

মেহেদী হাসান সিলেট থেকে

খেলা

‘ক্রিকেট সারা পৃথিবীতে একই। আমরা শুধু দেশ বদলাই, কিন্তু ক্রিকেটের মান বদলায় না’- এই একটি বাক্যেই যেন বর্তমান ক্রিকেটবিশ্বে ফ্র্যাঞ্চাইজি

2025-12-30T04:50:02+00:00
2025-12-30T04:50:02+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
খেলা
দেশ বদলায়, ক্রিকেট নয়
মেহেদী হাসান সিলেট থেকে
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:৫০ এএম 
পাকিস্তানের স্পিন অলরাউন্ডার ইমাদ ওয়াসিম। ছবি : সংগৃহীত
‘ক্রিকেট সারা পৃথিবীতে একই। আমরা শুধু দেশ বদলাই, কিন্তু ক্রিকেটের মান বদলায় না’- এই একটি বাক্যেই যেন বর্তমান ক্রিকেটবিশ্বে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের বাস্তবতা আর নিজের দর্শনটা স্পষ্ট করে দিলেন পাকিস্তানের স্পিন অলরাউন্ডার ইমাদ ওয়াসিম। অভিজ্ঞ এই অলরাউন্ডারের চোখে বিপিএল শুধু আরেকটি লিগ নয়; বরং কঠিন প্রতিযোগিতা, মানসম্মত ক্রিকেট আর শতভাগ দেওয়ার আরেকটি মঞ্চ।

বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ মানে নতুন দল, নতুন পরিবেশ। বিপিএলেও তার কদরটা অনেক। গত আসরে সিলেটের হয়ে খেলা এই পাকিস্তানি এবার খেলছেন ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে। তবে সেসব পেছনে ফেলে খুব দ্রুতই মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। বাংলাদেশে এসে কয়েক দিনের মধ্যেই সতীর্থদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে বোঝাপড়া। তার ভাষায়, ‘আমি এখানে চার দিনের একটু বেশি সময় আছি। আমরা সবাই দ্রুত জেলিং করছি। নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি মানে নতুন কোচ, নতুন খেলোয়াড় এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। তবে এখানে অনেক খেলোয়াড় আছে, যাদের সঙ্গে আগে খেলেছি বা বিপক্ষে খেলেছি। তাই আমার জন্য বিষয়টা সহজ হয়েছে।’

বিপিএলে তার দল ঢাকা এখন পর্যন্ত খেলেছে একটা ম্যাচ। সেই ম্যাচে জয়ও পেয়েছে। শুরুটা ভালো হলেও উচ্ছ্বসিত হতে নারাজ পাকিস্তান জাতীয় দলের সাবেক এ ক্রিকেটার। ‘একটা ভালো ম্যাচ হয়েছে এই পর্যন্তই। নিজেকে ভাসাতে চাই না’- সংযত আত্মবিশ্বাসে বললেন তিনি।

পিএসএল, সিপিএলসহ বিশ্বের নানা শীর্ষ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলা ইমাদের কাছে নতুন কোনো সিস্টেম নয়, বরং তার মতে ক্রিকেটের মূল কাঠামো সর্বত্রই এক, ‘বিশেষ করে যখন আপনি টপ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলেন। বিপিএল অন্যতম সেরা লিগ, কারণ বাংলাদেশ একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ। এখানকার (বিপিএল) মান কোনোভাবেই পিএসএল বা অন্য বড় লিগের চেয়ে কম নয়।’

বাংলাদেশে খেলতে এসে বিদেশি ও দেশি ক্রিকেটারদের মানের কথাও তুলে ধরেন তিনি, ‘এখানে খেলোয়াড়দের মান খুব ভালো, বিদেশিরাও আসে। তাই এটা সহজ কিছু নয়। চ্যালেঞ্জটা বড়। আমাদের লক্ষ্য একটাই প্রতিটা ম্যাচে শতভাগ দেওয়া।’

৩৭ বছর বয়সে পা দিয়েছেন, বলা যায় ক্যারিয়ারের শেষের পথে দাঁড়িয়ে। তবে মাঠে নামার আগ্রহ, ক্ষুধা আর দায়বদ্ধতায় কোনো ঘাটতি নেই ইমাদের। প্রস্তুতির ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব পরিষ্কার, ‘লিগ শেষে আমি কিছু দিন ক্রিকেট থেকে দূরে থাকি। তারপর আবার নতুন ক্ষুধা আর মানসিকতা নিয়ে ফিরি। পিএসএল, সিপিএল বা বিপিএল সব জায়গা আমার কাছে একই। এটা আমার পেশা, আমি এর জন্য পারিশ্রমিক পাই, আর মাঠে নেমে শতভাগ দেওয়াটাই আমার দায়িত্ব।’

আধুনিক টি-টোয়েন্টি পাওয়ার প্লেতে স্পিনারদের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। অন্যান্য লিগের তুলনায় বাংলাদেশের কন্ডিশনে যা নিয়মিতই দেখা যায়। এ নিয়ে ইমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। তার চোখে এটি ক্রিকেটের সৌন্দর্য, ‘একজন কোচ বা মালিক হিসেবে আপনি দলে সব ধরনের ভ্যারিয়েশন চাইবেন। লেফট-আর্ম স্পিন, লেগস্পিন, ফাস্ট বোলিং সবই আলাদা আলাদা শিল্প।’

তবে ইমাদ মানেন, পাওয়ার প্লেতে বোলিং সহজ নয়। এই সময়টায় দ্রুত রান তুলতে ব্যস্ত থাকেন ব্যাটাররা। সেসব মেনেই ইমাদ বললেন, ‘কখনো ভালো দিন আসে, কখনো খারাপ। কিন্তু শান্ত থাকতে হয়। আমার এক কোচ বলতেন, কাল আবার সূর্য উঠবে। আজ যা হয়েছে সেটা অতীত।’

পাওয়ার প্লেতে বোলিং করে পরিচিতি পাওয়া ইমাদ মনে করেন, এটি কোনো পরিকল্পিত কৌশলের চেয়ে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া উপহার, ‘টি-টোয়েন্টি যখন এগোতে শুরু করল, আমি আর্ম বল করতে শুরু করলাম। তখনই স্বীকৃতি পেলাম। পাওয়ার প্লেতে বোলিং কঠিন, কিন্তু এখানেই রোমাঞ্চ। এই ‘বাজ’টাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।’

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়ে দেন এই পাকিস্তানি স্পিনার। এরপর আবারও ফিরে আসেন অবসর ভেঙে। ফিরে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি, তাই আবারও অবসরের ঘোষণা দেন। তবে খেলে যাচ্ছেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট। এই অবসরভাঙা ফেরাকে আমলে নিতে নারাজ তিনি। তার মতে, যতদিন ক্রিকেটটা উপভোগ করবেন তিনি ততদিনই খেলে যাবেন। সেটিই অকপটে বললেন, ‘যেদিন ক্রিকেটে উত্তেজনা অনুভব করব না, সেদিন ক্রিকেট থেকেও দূরে চলে যাব।’ জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েও কোনো আফসোস নেই ইমাদের, ‘আমি যা পারতাম, সব করেছি। কোনো আক্ষেপ নেই, একদমই না।’

নিজের পথ ধরে নতুন প্রজন্মের স্পিনারদের উঠে আসাকে ইমাদ দেখেন ইতিবাচক চোখে, ‘পাওয়ার প্লেতে ফিঙ্গার স্পিন করা সহজ নয়। যারা এটা করছে, তারা চ্যালেঞ্জ নিতে শিখেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘদিন টিকে থাকা। এক দশকের বেশি সময় ধরে কেউ যদি এটা পারে, তা হলে বুঝতে হবে সে কিছু ঠিক করছে।’

জাতীয় দল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইমাদের কণ্ঠে স্পষ্ট আবেগ, ‘পাকিস্তানের জন্য নিজের শরীর, মন, আত্মা সবকিছু দিয়েছি। পাকিস্তানের কারণেই সারা বিশ্বে মানুষ আমাকে চেনে। এখন বাংলাদেশে খেলছি, কিন্তু আমি পাকিস্তানের প্রতিনিধি। আমি গর্বিত পাকিস্তানি ছিলাম, আছি এবং থাকব।’

পাকিস্তানের জার্সিতে লম্বা সময় ধরে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ক্যারিয়ারে আপস অ্যান্ড ডাউন থাকলেও সেসবকে ক্রিকেটের অংশ মনে করেই এগিয়ে চলছেন। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ইমাদ ফিরে গেলেন ২০১৭-তে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি তার জীবনের সেরা মুহূর্ত, সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপÑএই দুই স্মৃতি আজীবন বহন করবেন বলে জানালেন, ‘২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। এই দুটো স্মৃতি আমি আজীবন সঙ্গে রাখব।’

পাওয়ার প্লের ঝুঁকি, স্পিনের সাহস আর ক্রিকেটের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা- এই তিনের সমন্বয়েই ইমাদ ওয়াসিম। আর যতদিন এই উপলব্ধিটা থাকবে, ততদিনই ক্রিকেট মাঠে দেখা যাবে তাকে নিঃশব্দ আত্মবিশ্বাস আর শতভাগ দায়বদ্ধতা নিয়ে।

এএডি/


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: