রাজনৈতিক দলগুলোর একসুর

রফিক রাফি

প্রথম পাতা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ২৫ সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। বিশেষ

2025-10-13T00:42:01+00:00
2025-10-13T00:59:35+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা
রাজনৈতিক দলগুলোর একসুর
ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের বিচার
রফিক রাফি
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:৪২ এএম  আপডেট: ১৩.১০.২০২৫ ১২:৫৯ এএম
প্রতীকী ছবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ২৫ সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে বিরল এ ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে তৈরি হয় রীতিমতো কৌতূহল। তবে এ নিয়ে বেশ বড় ধরনের ঐকমত্য দেখা গেছে দলগুলোর মধ্যে। প্রায় সব দল থেকেই সেনাবাহিনীকে কলঙ্কমুক্ত করতে জড়িতদের নির্মোহ বিচার দাবিতে এসেছে বক্তব্য বিবৃতি। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বিশ্লেষকরাও। ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় মিলেছে সেনাবাহিনীর প্রশংসাও। 

রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্ররোচনায় দেশে গুম-খুনের রাজত্ব কায়েম করে। এসব ব্যক্তিবিশেষের বিচ্ছিন্ন অপরাধের সঙ্গে একটি দেশপ্রেমিক বাহিনীকে ঘিরে জনগণের আবেগ, আস্থা ও সম্মানের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকা উচিতও নয়। আইন ও সীমা লঙ্ঘনকারী এসব অপরাধীদের বিচার হোক, যাতে কোনো সরকার আর কখনো সেনাবাহিনীর কাছে গুম-খুনের মতো অন্যায় নির্দেশ দিতে না পারে। 

গুম কমিশন এবং আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর উভয়ই বলেছেন যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযুক্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। সেনাবাহিনীও বলছে, এই দায় কতিপয় ব্যক্তির। ট্রাইব্যুনাল বা ফৌজদারি আইনে সেনা কর্মকর্তা বা সেনা সদস্যদের বিচার হতে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে গত শনিবার সেনাসদরে এক ব্রিফিংয়ে মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান বলেছেন, ‘আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে। আমরা ন্যায়বিচারে থাকব। ন্যায়বিচারের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।’ 

শনিবার রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয় একটি দেশের চলা উচিত ‘ল অব দ্য ল্যান্ড’ অনুযায়ী। কিছু চিহ্নিত ব্যক্তির দায় যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো উচিত নয়, তেমনি তাদের অপকর্মের কারণে সেই প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও অনুচিত। একজন মানুষের কাজের ভালো-মন্দের দায়, বিশেষত গুরুতর অপরাধের শাস্তি, একান্তই তার নিজের।

এতে আরও বলা হয়, বিএনপি ফ্যাসিবাদের পুরো সময়জুড়ে সবচেয়ে বেশি গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার দল হিসেবে অবশ্যই সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের পক্ষে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নয়, বিবেচ্য কেবল ব্যক্তির অপরাধ ও আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিচ্ছিন্ন অপরাধের সঙ্গে একটি দেশপ্রেমিক বাহিনীকে ঘিরে জনগণের আবেগ, আস্থা ও সম্মানের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকা উচিতও নয়।

সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য এই দেশের, এই মাটির গর্বিত সন্তান। আর তাই, অধিকাংশ সেনাসদস্য নিশ্চিতভাবেই মন থেকে চান সীমা লঙ্ঘনকারীরা বিচারের মুখোমুখি হোক, যাতে কোনো সরকার আর কখনো সেনাবাহিনীর কাছে গুম-খুনের মতো অন্যায় নির্দেশ দিতে না পারে। সর্বজনীন এই আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিএনপি শতভাগ একমত।

মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুম-খুনের অভিযোগে কিছু কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ায় সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার রোববার এক বিবৃতিতে বলেন, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ গর্বিত থাকতে চান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বাহিনীর কতিপয় সদস্য দেশের বিদ্যমান আইন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্ররোচনায় প্রতিপক্ষ নিধনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন অন্ধ সহযোগী। ফলে গুম ও খুনের একটি ভীতিকর পরিবেশ দেশে সৃষ্টি হয়েছিল, যা একটি জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়। তবে সুনির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত হতে দেওয়া যায় না। অপরাধের দায় কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপরই বর্তাবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই বিচারপ্রক্রিয়াকে সহায়তা করার স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আমরা সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট অপরাধীরা যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি হবেনÑএমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকেই দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর প্রভাব সেনাবাহিনীতেও পড়েছিল। সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা, বিশেষত যারা র‍্যাব বা ডিজিএফআইয়ে এ দায়িত্বে ছিলেন, তারা গুম, খুন, ক্রসফায়ারসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সামনে এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলঙ্কমুক্ত করা, পুনর্গঠন করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। তাহলেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের অতিদ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেনাবাহিনীকে কলঙ্কমুক্ত করতে হলে, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। আমরা আশা করি, সেনা নেতৃত্ব এ বিষয়ে সরকার ও ট্রাইব্যুনালকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইগো বা মর্যাদার প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ন্যায়বিচার সেনাবাহিনীর মর্যাদা-সুরক্ষা দেবে। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চিহ্নিত অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। ন্যায়বিচার সেনাবাহিনীর মর্যাদা-সুরক্ষার জন্য জরুরি। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিচ্ছিন্ন অপকর্মের দায়ভার কোনোভাবেই সমগ্র প্রতিষ্ঠানের অভিযুক্তদের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, এর নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী, সুরক্ষিত ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে, ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অবলম্বন করতে হবে।

জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যে আওয়ামী লীগের আমলে যারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থায় থেকে অপরাধ করেছে। দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সেনাবাহিনী তাদের হেফাজতে নিয়েছে, এটা সাহসী পদক্ষেপ মনে করি। বাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। এই ঘটনায় পুরো বাহিনীকে দায়ী করতে পারি না। ব্যক্তির দায় ব্যক্তিকেই নিতে হবে। ন্যায়বিচার করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ ছাড়া বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদসহ (জাকসু) বিভিন্ন সংগঠন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আব্দুর রব খান অবশ্য বলছেন, এ ঘটনায় বাহিনীকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগসংক্রান্ত বিচারে সহযোগিতা করে সেনাবাহিনী প্রশংসা কুড়াবে। তিনি বলেন, এটা পুরো বিচার প্রক্রিয়ার অংশ। একে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই এবং এতে পুরো জাতি জড়িত। আমি মনে করি যেভাবে এগোচ্ছে সেটি যথাযথ। এটাকে ম্যাটার অব ফ্যাক্টস হিসেবে নেওয়াই উত্তম। এর সঙ্গে পুরো প্রতিষ্ঠানকে টানা ঠিক হবে না।

সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিকও বলছেন, বিডিআর বিদ্রোহে সামরিক অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে প্রচলিত বেসামরিক আদালতে। এটা নিয়ে তখন সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়া হয়েছিল। তারাও বলেছিল নরমাল আদালতেই বিচার হতে পারে। সুতরাং অতীতের উদাহরণ পর্যালোচনায় এটা বলা যায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেসামরিক আদালতে সেনা কর্মকর্তাদের বিচারে বাধা নেই।

গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের ২ মামলায় ৩০ জন আসামির মধ্যে ২৫ জনই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৯ জন অবসরপ্রাপ্ত, একজন এলপিআরে গেছেন এবং বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৫ জন। এদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের আগামী ২২ তারিখের মধ্যে গ্রেফতার করতে বলা হয়েছে। পরোয়ানা জারির পর এদের মধ্যে থেকে ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মেজর জেনারেল কবির আহাম্মদ পলাতক রয়েছেন।

সময়ের আলো/ কেএইচও


  বিষয়:   ট্রাইব্যুনাল  সেনা  সদস্য  বিচার  রাজনৈতিক  দল  একসুর 


Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: