বিয়ে করার আশায় মালয়েশিয়ায় ছুটছেন রোহিঙ্গা তরুণীরা

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া

সারাদেশ

‘বয়সটা বাড়ছে। আমিতো মেয়ে। বিয়ে করতে তো হবে। এভাবে আর কত দিন?’ বলছিলেন উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা তরুণী তাহমিনা বেগম।

2025-10-26T04:37:43+00:00
2025-10-26T04:37:43+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বিয়ে করার আশায় মালয়েশিয়ায় ছুটছেন রোহিঙ্গা তরুণীরা
কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া
প্রকাশ: রোববার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫, ৪:৩৭ এএম 
রোহিঙ্গা নারী সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা। ছবি : সময়ের আলো
‘বয়সটা বাড়ছে। আমিতো মেয়ে। বিয়ে করতে তো হবে। এভাবে আর কত দিন?’ বলছিলেন উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা তরুণী তাহমিনা বেগম। ‘পরিবারের সিদ্ধান্তে’ বিয়ে করে সংসার পাততে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাঁর বিয়ের স্বপ্ন পূরণ হলো না।

তাহমিনা একা নন। স্থানীয় কোস্টগার্ড ও এনজিও সূত্রে জানা গেছে, অনেক রোহিঙ্গা নারী দালালদের প্রলোভনে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু অধিকাংশই ফাঁদে পড়ে গহীর পাহাড়ে আটকা পড়ছেন। সেখানে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। 

সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এমন ৪৪ নারী-শিশুকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। তাদের মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যাদের মধ্যে ২৪ নারীও ছিলেন, যারা বিয়ে করে সংসার পাততে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে এসেছিলেন।

তেমনই একজন রোহিঙ্গা তরুণী আসমিদা। ১৭ বছরের এই রোহিঙ্গা কিশোরী বলেন, ‘আমার বাবা নেই, শুধু মা আছেন। আমাদের আত্মীয়-স্বজন মালয়েশিয়ায় থাকে। তাদের মাধ্যমে মোবাইলে এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। সেই ছেলেকে বিয়ে করতে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম।’

বিয়ে করতে মালয়েশিয়া কেন গন্তব্য রোহিঙ্গা নারীদের?
জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের কাছে মালয়েশিয়া এখনো সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়স্থল। সেখানে বৈধ এবং অবৈধভাবে তিন লাখের মত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের সিংহভাগই গেছেন সাগর-পথে মানব পাচার কারীদের হাতে। তাদের মধ্যে লাখ দেড়েক জাতিসংঘের চেষ্টায় শরণার্থী হিসাবে রয়েছেন, বাকিরা অবৈধভাবে লুকিয়ে থাকেন।

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ দোকান-পাট, রেস্টুরেন্টে কাজ করেন অনেকে। পাম বাগান এবং কৃষি খামারে কাজ করেন। এছাড়া, যারা অনেকদিন ধরে রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ দোকানপাট করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে বিয়ে করতে চাইলে বরপক্ষকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বেশি নগদ দিতে হয়। বেশির ভাগ পরিবারের সে সামর্থ্য নেই। সে তুলনায় মালয়েশিয়ায় বিয়ের বাজারে রোহিঙ্গা নারীদের চাহিদা রয়েছে। কারণ সে দেশের শ্রমবাজারের একটি অংশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা যুবকদের দখলে। রোহিঙ্গা পুরুষের তুলনায় সেখানে রয়েছে রোহিঙ্গা নারীর অভাব।

উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীদের নিয়ে কাজ করে নারী জাগরণ সংস্থা। এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী শিউলি শর্মা বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই মালয়েশিয়া গিয়ে বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর। তারা মনে করে যে, মালয়েশিয়া যেতে পারলে তাদের ভালো বিয়ে হবে। এ ধারণা তাদের ঢুকিয়ে দিয়েছে মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট। ফলে তাদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী।


বিয়ের প্রলোভনে পাচার, মুক্তিপণ আদায়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় দরিদ্র মানুষদের বিদেশে পাঠানোর প্রলোভনে ফাঁদ পাতছে। তারা উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের আশ্বাস এবং বিনা খরচে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে নারী ও শিশুদের পাহাড়ে এনে জিম্মি করে রাখে। এরপর তাদের পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে এবং সুযোগ বুঝে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা করে।

সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে এখন মানবপাচারকারীদের তৎপরতাও বেড়েছে। তাছাড়া কিছু রোহিঙ্গা আছে, যাদের স্বজন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেছ। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত স্বজনদের মালয়েশিয়া নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রেও মানবপাচারকারীরা সহায়তা করছে।

টেকনাফ ব্যাটালিয়ন ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, মানবপাচার ও অপহরণকারী চক্র পাহাড় এবং সমুদ্র সৈকত ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিম্মি করে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার করছে। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে পাহাড় ও সাগরে বিজিবির কঠোর অভিযান জোরদারের ফলে মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিজিবির সফলতা এসেছে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে বিজিবির ধারাবাহিক অভিযান চলছে।

কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার সালাউদ্দিন রশিদ তানভীর বলেন, পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। খুব শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।


প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান
রোহিঙ্গা সংকটের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন বলে মনে করছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, যতদিন না রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে, ততদিন আমরা এই সংকটের কোনও টেকসই সমাধান দেখছি না।

তিনি বলেন, ‘বিগত আট বছর ধরে সরকার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গত এক বছরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দুইবার ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। তিন দিনের আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে এবং অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও এই সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদ পেয়ার জানান, রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় পাচার হচ্ছে। যারা স্বেচ্ছায় পালিয়ে যেতে চায় তাদের ধরা কঠিন। আর এর মধ্যে মানবপাচারকারীরা সহযোগিতা করলে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। 

সময়ের আলো/কেএইচও



  বিষয়:   বিয়ে  মালয়েশিয়া  রোহিঙ্গা  তরুণী 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: