দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালেরই যখন রুগ্নদশা, ঠিক তখনই সুখবর পাওয়া গেল নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে গত বছরের ৯ মাসের চেয়ে চলতি বছরের ৯ মাসে রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে সরকারের রাজস্ব আয়। সেবার পরিধিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অবশ্য হাসপাতালে প্রকট জনবলসংকট রয়েছে। ৫৮টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ২৮টিই ফাঁকা পড়ে আছে। এ ছাড়া লোকবল নেই ৬৩টি পদে। সীমিত জনবল নিয়েই চলছে সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের চেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে নাটোর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
নাটোরের সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মুক্তাদির আরেফীন বলেন, শুধু সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, সেবার মান বৃদ্ধিতেও আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। হাসপাতালের শূন্য পদ পূরণে চেষ্টা অব্যাহত আছে। আশা করি, শিগগিরই শূন্য পদ পূরণ করে হৃদরোগ, কিডনিসহ অন্যান্য বিভাগের কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে নাটোরবাসীকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। নাটোর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৩০-১৫০টি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্যাথলজি, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের এই সংখ্যা বেড়ে হয় ছয় লাখ ৪৯ হাজার। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১২ লাখ ৬৪ হাজারে। নাটোর সদর হাসপাতালের আরেক আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সোহরাব আলী সম্রাট বলেন, বিপুলসংখ্যক রোগীর সমাগমে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছি আমরা। অটোমেশন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সফটওয়্যার পরিবর্তন করে স্থানীয়ভাবে দ্রুতগতির সফটওয়্যার সংযোজন করতে যাচ্ছি। এতে কাজে গতি আসবে, রোগীরা লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবেন।
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এই হাসপাতালে মোট ২৬৫টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৬৪ জন। শূন্য পদের সংখ্যা ১০১। হাসপাতালটি আগে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ছিল, যা পরে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে হাসপাতালে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৩ জন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৯৭৯ জনে। অর্থাৎ রোগীর সংখ্যা ২৭ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে সরকারি রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৪ লাখ ৮৪ হাজার ৪৫১ টাকা। এ বছর একই সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছে এক কোটি ছয় লাখ ৫৪ হাজার ৮২৭ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় রাজস্ব আয় বেড়েছে ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালে প্যাথলজি, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি পরীক্ষার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সময়সীমা বৃদ্ধি করে ইভিনিং শিফট চালু করায় জনসাধারণ সেবা গ্রহণে উৎসাহী হচ্ছেন। আগে প্যাথলজি পরীক্ষার সময় বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত থাকলেও বর্তমানে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে এবং রাত ৮টা পর্যন্ত বিল কাউন্টার খোলা রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টাই ইসিজি করতে পারছেন রোগীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ড নতুন ভবনে সুপরিসর স্থানে স্থানান্তর করায় সেবার মান উন্নয়ন হয়েছে। কোভিডসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগীর জন্য নতুন আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। নতুন ভবনে চারটি কেবিনসহ মোট ছয়টি কেবিনে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। স্টমাক ওয়াশ রুম তৈরি করা হয়েছে। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথকভাবে জরুরি টিকেট কাউন্টার চালুর পাশাপাশি চারটি বেড সংযোজন করে জরুরি পর্যবেক্ষণ কক্ষও স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক কাজ করছে হেল্প ডেস্ক। জরায়ু ক্যানসার শনাক্তকরণে কোলনোস্কোপি চালু করা হয়েছে। অচল অ্যাম্বুলেন্স সচল করা হয়েছে। ইপিআই টিকাদান কক্ষ চালু করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা, জুলাই যোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এক্সপ্রেস কাউন্টার কাজ করছে। অপারেশন থিয়েটার, ফার্মেসি, এনসিডিসি কর্নারের কার্যক্রম পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। অটোমেশন কার্যক্রমের সিস্টেম সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মোশাররফ বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক এবং অন্যান্য কর্মরত ব্যক্তিদের অটোমেশন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ চলমান আছে। টিকেট কাউন্টার ও বিল কাউন্টারে ই-টিকেট, এনসিডিসি কর্নার ও ডেন্টাল বিভাগে ই-প্রেসক্রিপশন, প্যাথলজিতে ই-রিপোর্ট এবং ফার্মেসি ও অপারেশন থিয়েটারের ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন চালু করা হয়েছে। হাসপাতালের সব কার্যক্রমকে শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি। মোট ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৫০ জন রোগীর অনলাইন নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।
হাসপাতালের সহকারী প্যাথলজিস্ট আল আমিন বলেন, আগে একটি ইলেকট্রোলাইটিস এবং বায়োকেমিস্ট্রি এনালাইজার ছিল। বর্তমানে নতুন আরও দুটি যুক্ত করা হয়েছে। সেল কাউন্টারের সঙ্গেও নতুন আরেকটি সংযোজন করা হয়েছে। রি-এজেন্টের সরবরাহ পেলে অতিদ্রুত হরমোন পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা নাজমা বেগম বলেন, আরবিসি, সিবিসি, ইউরিন, আরএমই, ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করালাম। রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। রিপোর্টের ওপর শতভাগ ভরসা আছে আমার।
অবশ্য হাসপাতালের অভ্যন্তরে পরিছন্নতা, খাবার সরবরাহ এবং সরকারি ওষুধ প্রাপ্তিতে ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন রোগীরা। শাহনাজ খাতুন নামের এক নারী সেবাপ্রত্যাশীর অভিযোগ, হাসপাতালে ভালো ভালো ডাক্তার আছেন। কিন্তু যথাসময়ে টিকেট পাই না। অনেক ভিড়ের মধ্যে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শত শত রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেককে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নারী রোগীর অভিযোগ, গত ৫-৭ দিন থেকে ভর্তি আছি। কিন্তু কোনো পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে পরিষ্কার করতে দেখিনি। এ ছাড়া ভর্তি রোগীদের সবাই হাসপাতালের খাবার ঠিকমতো পায় না।
সময়ের আলো/এনএ