সারা বছরের ব্যস্ত সময় পার করে চাকরিজীবী বা অন্যান্য পেশার মানুষরা শীতকালটা একটু আরাম আয়েশে কাটাতে চায়। সে হিসেবে ধরা হয় শীত মানেই বছর শেষ, আর ঘোরাঘুরি। কারণ অনেকেই বছরের এই শেষ সময়ে ছুটি পেয়ে থাকেন। সেই ছুটিতে দেশ-বিদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করেন অনেকে।
আবার প্রকৃতির কাছে নতুন করে সঁপে দেওয়া নতুন এক ঋতুর নাম শীতকাল। এই সময় বাংলাদেশের মানুষরা উষ্ণ কম্বলের নিচে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তখন এশিয়ার কিছু দেশ তাদের ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভ্রমণপিপাসুদের হাতছানি দেয়।
নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান— এশিয়ার কয়েকটি দর্শনীয় দেশের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্র হোক বা পাহাড়, আরামের সফর অথবা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার— ভ্রমণের সময় এখনই! একটু হিসাব করলেই দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ঘুরতে খরচও খুব একটা বেশি পড়ে না। যারা শীতের এই সময়ে বিদেশে প্রকৃতির বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এশিয়ার এ পাঁচটি দেশ হতে পারে এবারের শীতের এক ভ্রমণ-স্বপ্নের ঠিকানা।
হিমালয়ের কোল ঘেঁষা নেপাল
বাংলাদেশে শীতে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন, তখন হিমালয়ের দেশ নেপালের আকাশ হয়ে ওঠে ঝকঝকে পরিষ্কার। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস হলো নেপালে ট্রেকিং ও পর্বত দেখার জন্য এক কথায় সেরা সময়। শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকলেও দিনের বেলা আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় এভারেস্টসহ অন্যান্য পর্বতশৃঙ্গের তুষারাবৃত চূড়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য পাওয়া যায়। কম উচ্চতার অঞ্চল হিসেবে পোখরা বা চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই সময়টা বেশ আরামদায়ক। স্থানগুলো একইসঙ্গে সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং শান্ত প্রকৃতির জন্যও সুপরিচিত।
নেপালের অন্নপূর্ণা অঞ্চলের জনপ্রিয় ট্রেকিং গন্তব্য ঘন্দ্রুক গ্রাম।
হাতে কতদিনের ছুটি আছে, তার উপর নির্ভর করে নেপাল ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজাতে হবে। হাতে সময় কম থাকলে আকাশপথে পাড়ি দিতে পারেন। তবে খরচ বাঁচিয়ে ট্রেনেও যাওয়া যায়। তিন-চার দিনের ছুটি পেলে কাঠমান্ডু এবং তার আশপাশের কিছু এলাকা ঘুরে দেখে আসতে পারেন। তার বেশি সময় থাকলে পোখরা এবং তার আশপাশের এলাকায় যেতে পারেন। কাঠমান্ডুর অলিগলি, পুরনো শহর, সন্ধ্যায় বৌদ্ধমন্দির দেখে মন ভাল হবে। খরচও খুব বেশি নয়।
শান্তির অন্বেষণে ভুটান
ভুটান এই সময়ে শান্ত ও স্নিগ্ধ থাকে। যদিও পাহাড়ি অঞ্চলে বেশ ঠাণ্ডা থাকে, তবে প্রধান উপত্যকাগুলো যেমন- পারো, থিম্পুতে মনোরম রোদে ঝলমলে দিন পাওয়া যায়। তুষারপাত ভুটানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। শীতকালে এখানে পর্যটকের ভিড় কম থাকায় মঠ ও দুর্গগুলো (জং) শান্ত পরিবেশে ঘুরে দেখা যায়। যারা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির গভীর নীরবতা উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ভুটান হলো আদর্শ গন্তব্য।
ভুটানের রিনপুং জং পারো উপত্যকায় অবস্থিত বৃহৎ দুর্গ এবং বৌদ্ধ বিহার।
সড়ক অথবা আকাশপথে খুব সহজেই যাওয়া যায় ভুটান। সড়কপথে গেলে সময়টা একটু বেশি যাবে। তবে হাতে সময় থাকলে ট্রেনে চেপেও যেতে পারেন। আলাদা একটা মজা হবে।
জলে ঘেরা বিস্ময় মালদ্বীপ
শীতকালে যারা শীতকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে চান, তাদের জন্য মালদ্বীপ হলো এক উষ্ণ আশ্রয়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস এখানে শুষ্ক মৌসুম। এই সময়ে আকাশ থাকে ঝলমলে, সমুদ্র শান্ত এবং বৃষ্টিপাতের হার প্রায় শূন্য। এটি ডাইভিং, স্নরকেলিং এবং অন্যান্য জলজ কার্যকলাপের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সমুদ্রের নিচের প্রবাল প্রাচীর এবং রঙিন মাছের জীবন এই সময়ে তারা সেরা রূপে ধরা দেয়। কোনো ভিলা বা ওয়াটার কটেজে বসে বিশ্বের সেরা বিলাসবহুল অবকাশ যাপনের অভিজ্ঞতা নিতে হলে মালদ্বীপের জুড়ি নেই।
মালদ্বীপের জুমেইরাহ ওলহাহালি দ্বীপ রিসোর্ট লাক্স নর্থ মেল অ্যাটল।
মালদ্বীপে সাধারণত বিমানে চেপে যেতে হয়। তিন-চার দিনের ছুটি পেলে রাজধানী মালে এবং তার নিকটবর্তী পাবলিক আইল্যান্ড বা স্থানীয় দ্বীপগুলো যেমন- মাফুশি, থোড্ডু ঘুরে দেখে আসতে পারেন। তবে বেশি সময় থাকলে এবং বাজেট থাকলে একটি অথবা দুটি ভিন্ন অ্যাটলের বিলাসবহুল রিসোর্টে যেতে পারেন। সমুদ্রের নিচে ডাইভিং, বিলাসবহুল ওয়াটার ভিলা এবং সন্ধ্যায় সৈকতে রিল্যাক্স করে মন ভালো হবে। তবে নেপালের তুলনায় এখানে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি।
বৈচিত্র্যের আধার ভিয়েতনাম
এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দেশ ভিয়েতনাম শীতকালে তার বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। দক্ষিণে হো চি মিন সিটি শুষ্ক এবং উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। অঞ্চলটি সমুদ্র সৈকত বা মেকং ডেল্টা ভ্রমণের জন্য চমৎকার। অন্যদিকে, উত্তরের হা লং বে বা হ্যানয়ের মতো স্থানগুলোতে শীতল এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া থাকে। সেখানকার সবুজ পাহাড় আর চুনাপাথরের কার্স্ট শিলাগুলোর মধ্যে এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে এই আবহাওয়া। এছাড়াও ঐতিহাসিক স্থান, সুস্বাদু স্ট্রিট ফুড এবং প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর বৈচিত্র্য উপভোগের জন্য ভিয়েতনাম এক অসাধারণ গন্তব্য।
ভিয়েতনামের দা নাং-এর না হিলস রিসোর্টের গোল্ডেন ব্রিজ।
আকাশপথে হ্যানয় বা হো চি মিন সিটিতে পাড়ি দিতে পারেন। তিন-চার দিনের ছুটি পেলে উত্তরের মনোমুগ্ধকর হা লং বে এবং রাজধানী হ্যানয় ঘুরে দেখে আসতে পারেন। তার বেশি সময় থাকলে দেশের দক্ষিণে হো চি মিন সিটি এবং মেকং ডেল্টার দিকে যেতে পারেন। হা লং বে-তে ক্রুজিং, হ্যানয়ের ওল্ড কোয়ার্টারের জীবনযাত্রা দেখে এবং সুস্বাদু স্ট্রিট ফুড খেলে মন ভালো হবেই। এখানকার খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ব্যাকপ্যাকার তথা ছোট ট্যুর গ্রুপের জন্য আদর্শ পর্যটন এলাকা হিসেবে ধরা হয় ভিয়েতনামকে।
ইতিহাসের নীরব দর্শনীয় স্থান পাকিস্তান
যদিও শীতকালে পাকিস্তানের কিছু অংশে তীব্র ঠাণ্ডা পড়ে, তবুও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণের জন্য এই সময়টি বেছে নেওয়া যেতে পারে। লাহোর, ইসলামাবাদ এবং করাচির মতো শহরগুলোর আবহাওয়া এই সময়ে তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা ও সহনীয় থাকে। শীতকালে পর্যটকের ভিড় কম থাকায় ঐতিহাসিক দুর্গ, মসজিদ এবং মুঘল স্থাপত্য শান্তভাবে ঘুরে দেখা যায়। বিশেষ করে লাহোরের রঙিন সংস্কৃতি এবং খাদ্যশৈলী উপভোগের জন্য এই সময়টি আরামদায়ক। যারা ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভালোবাসেন, তাদের জন্য পাকিস্তান এক নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
পাকিস্তানের নারান উপত্যকার বাটাকুন্ডির রুমি মাউন্টেন টপ রিসোর্ট।
তিন-চার দিনের ছুটি পেলে আকাশপথে ঐতিহাসিক শহর লাহোর এবং রাজধানী ইসলামাবাদ ঘুরে দেখে আসতে পারেন। তার বেশি সময় থাকলে উত্তর পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা, যেমন- মারি বা নাথিয়া গালির দিকে যেতে পারেন। লাহোরের মুঘল স্থাপত্য, বাদশাহী মসজিদ, স্থানীয় খাবার এবং ইসলামাবাদে ফয়সাল মসজিদের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে মন ভালো হবে। এখানকার খরচ তুলনামূলকভাবে কম, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে।
এসকে/