‘আঠারো’ সংখ্যাটি বাংলাদেশের জন্য পয়া। ভারতের বিপক্ষে এমন এক আঠারো তারিখে (১৮ জানুয়ারি, ২০০৩) সবশেষ জিতেছিল। ঘটনা আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর পুরোনো। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে সেদিন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারত।
নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র হলে, ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে বাজিমাত করেন মতিউর রহমান মুন্না। এই মিডফিল্ডারের গোল্ডেন গোলে সেদিন ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় লাল-সবুজরা। সেবার বাংলাদেশ শুধু সাফের ফাইনালেই জায়গা করে নেয়নি; মালদ্বীপকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সেই ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ২০০৩ সালের পর পদ্মা-গঙ্গায় অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু ভারতকে হারানোর সাধ্য হয়নি।
আরেকটা আঠারো তারিখে আজ আবারও ভারতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের ফিরতে লেগে ঘরের মাঠে প্রতিবেশী দেশটিতে আতিথ্য দেবে লাল-সবুজরা। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে রাত ৮টায় শুরু হবে ম্যাচটি। এবার নতুন ইতিহাস রচনা করতে চান জামাল-হামজারা। ঘরের মাঠে ভারতকে হারাতে চান। এর আগে খুব কাছে গিয়েও হারাতে পারেনি। সবশেষ দেখাতেও ভারতের সল্টলেগে গোলশূন্য ড্র নিয়ে দেশে ফিরেছেন জামাল, তপু, হামজারা। ড্রয়ের হতাশায় আর পুড়তে রাজি নন বাংলাদেশের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া, চান না ঘরের মাঠে হারের তেতো স্বাদ বরং বছরের শেষ ম্যাচটা জয়ে রাঙাতে চান। পয়া আঠারো তারিখকে আরও একবার স্মরণীয় করতে চান।
বাংলাদেশ-ভারতের ফুটবল দ্বৈরথ বেশ পুরোনো। ৪৭ বছর আগের। একসময় দুই দলের ম্যাচ নিয়ে তেমন উত্তেজনা-উদ্দীপনা না থাকলেও; এখন এই ম্যাচকে ডার্বি, হাইভোল্টেজ নানা উপাধি দেওয়া হচ্ছে। দর্শকরাও দুদলের খেলা দেখতে মুখিয়ে থাকেন। আজ বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ কিন্তু এর ব্যতিক্রম নয়। যেদিন থেকে এই ম্যাচের টিকেট বিক্রির ঘোষণা এসেছে কিংবা অনলাইনে টিকেট ছেড়েছে। সেদিন মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। উত্তেজনা কোন অবস্থায় চলে গেছে—টিকেট বিক্রি তার সামান্য নমুনা। গত চার যুগে বাংলাদেশ-ভারত ৩২ বার পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশ জিতেছে কেবল ৩ ম্যাচে। ১৩টি ড্র এবং ১৬টি ম্যাচে পরাজিত হয়েছে। আজ ৩৩ বারের দেখায় র্যাঙ্কিংয়ে ৪৭ ধাপ এগিয়ে থাকা ভারতের বিপক্ষে পেরে ওঠবে তো হাভিয়ের ক্যাবরেরার দল?
আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিজেদের শক্তিশালী মনে করছেন বাংলাদেশের কোচ ক্যাবরেরা। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে ভারতকে ঘরের মাঠে হারাতে হলে শিষ্যদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন এবং ম্যাচের গুরুত্ব বুঝে শক্ত মানসিকতা নিয়ে লড়াইয়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে বলেছেন।
সোমবার ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবরেরা জানান, এই ম্যাচে অনেক আবেগ জড়িত, ডার্বির আবহটা সবার জন্যই স্পেশাল। দল আবেগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেটাই আসল। এই ম্যাচের গুরুত্ব আমাদের প্রেরণা দিচ্ছে, এটা ভালো। কিন্তু আমরা দল নিয়ে আলোচনা করেছি যে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাটাও জরুরি, যেন জিততে পারি। কারণ আমাদের সামর্থ্য আছে, আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। তাই ভারতের বিপক্ষে অবশেষে জয়ের সুযোগটা নিতে হবে। এখন এটা আমার ব্যাপার নয়, সত্যি বলতে আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী যে কাল (আজ) তিন পয়েন্ট নিতে পারব। তারপর যা বলার বলব।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা শেষ মুহূর্তে গোল হজম। সবশেষ হংকং এবং নেপাল ম্যাচেও এমন ঘটনা ঘটেছে। নিশ্চিত ড্র কিংবা জয়ের ম্যাচ প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিচ্ছেন জামাল, সাদরা। ভারত ম্যাচে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চান না ক্যাবরেরা।
এ ব্যাপারে কোচ বলেন, যদি আমরা তিন পয়েন্ট পেতে চাই, অবশ্যই কাল এমন কিছু ঘটতে দেওয়া যাবে না। এসব পরিস্থিতি আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে, সেগুলো থেকে শিখতে হবে, কাজ করতে হবে। কখনো আমরা এসব পরিস্থিতি ভালোভাবে সামলেছি। যেমন হংকংয়ের অ্যাওয়ে ম্যাচে আমরা বক্স খুব ভালোভাবে ডিফেন্ড করেছি। নেপালের বিপক্ষে আবার একই পরিস্থিতি হয়েছিল। এ কারণেই তো প্রস্তুতি ম্যাচ হয়। এখন আমাদের সেই প্রস্তুতি ম্যাচে (নেপালের বিপক্ষে) যা হয়েছে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে, নিশ্চিত করতে হবে কাল (আজ) যেন এমন কিছু না ঘটে।
বাংলাদেশের মতো ভালো অবস্থানে নেই ভারতও। এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে তারাও তলানিতে অবস্থান করছে। দলের অভিজ্ঞ সুনীল ছেত্রী অবসরে চলে গেছেন। এ অবস্থায় নিজের দলকে এগিয়ে রাখছেন বাংলাদেশের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া।
ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা যে অবস্থায় আছি এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড। তাই অবশ্যই আমাদের একটা বড় সুযোগ আছে। জামাল আরও যোগ করেন, এটা অনেক ইমোশনাল ম্যাচ, হাইভোল্টেজ ম্যাচ। এই ম্যাচের পর জাতীয় দলের জন্য অনেক লম্বা গ্যাপ আছে। বছরটা যদি জয় দিয়ে শেষ করতে পারি তা শুধু আমাদের জন্য নয়, সমর্থক ও আপনাদের জন্যও ইতিবাচক হবে। তাই আমার জন্য ম্যাচটি আবেগের, একই সঙ্গে মস্তিষ্ক ব্যবহার করে খেলতে হবে। কালকের (আজ) ম্যাচে অনেক ফ্রি-কিক হবে, হলুদ কার্ড হবে, গালাগাল হবে। তবে আমি এটা স্বাভাবিক ম্যাচ হিসেবে ধরব। এই ম্যাচের তাৎপর্য আমি জানি।
এএফসি এশিয়ান কাপে জিততে মরিয়া বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষকে সমীহের চোখে দেখলেও জিততে চায় ভারতও। সব মিলে আজ দারুণ এক লড়াইয়ে প্রত্যাশা সবার।
এফআর