৯ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছরই জীবন, সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ভৌগোলিক অবস্থান এসব

2025-11-21T23:47:42+00:00
2025-11-21T23:48:08+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
৯ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:৪৭ পিএম  আপডেট: ২১.১১.২০২৫ ১১:৪৮ পিএম  (ভিজিট : ৩৯২৭)
ভূমিকম্পে রাজধানীর বংশালে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। ছবি : সময়ের আলো
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছরই জীবন, সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ভৌগোলিক অবস্থান এসব দুর্যোগের অন্যতম কারণ। নতুন করে দেখা দিয়েছে ভূমিকম্প। সম্প্রতি মাঝারি ধরনের ভূকম্পন অনুভূত হলেও শুক্রবার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে। 
# পৃথিবীর যত বড় বড় ভূমিকম্প সবগুলোই এ সাবডাকশন জোনে সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশও সাবডাকশন জোনে রয়েছে।
# বাংলাদেশে ৯ মাত্রার শক্তিসম্পন্ন ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়ে আছে। 
# ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যেটির কোনো পূর্বাভাস নেই। এটি মোকাবিলায় নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে।
# ভূমিকম্প মাসে তিনবার কেন, দিনেও তিনবার হতে পারে। 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। এ জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। 

তারা বলেন, বাংলাদেশে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মণিপুর, মিজোরাম, মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের হাওড় দিয়ে মেঘনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামানের পাশ দিয়ে দক্ষিণে যদি একটি রেখা কল্পনা করা যায়, তা হলে দেখা যাবে এলাকাটি দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল। এ দুটি প্লেটের মধ্যে পূর্বে অবস্থিত বার্মা প্লেট, পশ্চিমে অবস্থিত ইন্ডিয়ান প্লেট। এর সংযোগস্থলের ওপরের ভাগটি অর্থাৎ সুনামগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে পূর্বে মণিপুর, মিজোরাম পর্যন্ত অঞ্চলটি ‘লকড’ হয়ে আছে। অর্থাৎ এখানে শক্তি জমা হয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তিসম্পন্ন ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়ে আছে। যেকোনো সময় এ শক্তি বের হয়ে আসতে পারে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

বাংলাদেশে এ বছর প্রথম ভূকম্পন অনুভূত হয় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের পাশাপাশি কেঁপে ওঠে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলাও। ৩ দশমিক ৯ মাত্রার এ ভূমিকম্পে জানমালের তেমন ক্ষতি হয়নি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে মাঝারি মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশটির আয়াবতি ও রাখাইন রাজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজারেও ভূকম্পন অনুভূত হয়। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবুল কালাম মল্লিক জানান, রাখাইন রাজ্যের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আগারগাঁও থেকে ৩৭৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। চট্টগ্রামে গত ৩০ এপ্রিল ৪ দশমিক ৬ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। 

চট্টগ্রাম আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মেঘনাথ তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল অক্ষাংশ ২২ দশমিক ৯৩ ডিগ্রি উত্তর, দ্রাঘিমা ৯৪ দশমিক ১৯ ডিগ্রি পূর্ব মিয়ানমারের মাউলাইকে। রাজধানীর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্র থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এর দূরত্ব ছিল ৪০০ কিলোমিটার। গত ৫ মে রাজধানীতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। গত ১৬ জুন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়। ঢাকা ছাড়াও সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ থেকে ভূকম্পনের তথ্য আসে। 

আবহাওয়া অধিদফতরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের গোলাপগঞ্জ। অবশ্য ভূমিকম্পের পরপরই বিভিন্ন মাধ্যমে যে তথ্য পাওয়া যায় সেখানে বলা হয়, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভারতের শিলংয়ে।


গত ১৪ আগস্ট সিলেটে ফের ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। একই সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জেলায়ও এটি অনুভূত হয়। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল আসামের মেঘালয়। উৎপত্তিস্থলে এর গভীরতা ছিল ৩৫ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ২২৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে। ঠিক ১৬ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৯ আগস্ট সিলেট মহানগরীর আশপাশে ফের মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তাপুরে। সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে ৪.২ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৫৯ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইল সদরে। ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫ কিলোমিটার নিচে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের আশপাশ দিয়ে তিনটি টেকটোনিক প্লেট গেছে। এগুলোর সংযোগস্থল আমাদের সীমান্তের আশপাশে। যেমন : আমাদের উত্তরে হিমালয় পড়েছে ইউরেশিয়ান প্লেটে। আমাদের অবস্থান ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটে। আর আমাদের পূর্বে হচ্ছে বার্মার মাইক্রো প্লেট। এ তিনটি প্লেটই আমাদের কানেক্টেড এবং সক্রিয়। প্লেটগুলোর মুভমেন্ট আছে। এগুলো প্রতি বছরে পাঁচ সেন্টিমিটার বা ৫০ মিলিমিটার মুভমেন্ট করে। তার মানে, প্রতি বছর আমরা পাঁচ সেন্টিমিটার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মুভমেন্ট করছি। একইভাবে পুরো পৃথিবীও মুভ করছে।

তিনি বলেন, পৃথিবীর মুভমেন্ট তিনটি ক্রাইটেরিয়ায় সম্পন্ন হচ্ছে। প্রথমটি হলো, কনভারজেন্ট মুভমেন্ট, অর্থাৎ দুটি প্লেট একই দিকে পরিচালিত হয়ে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়টি হলো, একটি প্লেট একদিকে এবং অপরটি বিপরীত দিকে মুভ করছে। এটিকে বলে ডাইভারজেন্ট মুভমেন্ট। তৃতীয়টি হলো, ল্যাটেরাল মুভমেন্ট, অর্থাৎ যদি কোনো একটি প্লেট স্টাবল থাকে এবং অপরটি মুভ করে। এ তিন ক্রাইটেরিয়ায় পৃথিবী মুভ করছে।


এ আবহাওয়াবিদ বলেন, নেপালে যেমন ইউরেশিয়ান প্লেট আর আমাদের ইন্ডিয়ান প্লেট (বাংলাদেশ যে প্লেটে অবস্থান করছে)। দুটি প্লেটের কনভারজেন্ট মুভমেন্ট বিদ্যমান। কনভারজেন্ট মুভমেন্ট হওয়ায় একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের দিকে মুভ করছে এবং একটি প্লেট গ্র্যাজুয়ালি রাইজিং করছে। অর্থাৎ হিমালয়ের যে উচ্চতা, যেটি গত বছর যা ছিল তার চেয়ে একটু হলেও বেড়েছে। এ জন্য যখন প্লেট মুভ করে এবং কোনো কারণে যদি ওখানে মুভমেন্ট কম হয় বা মুভমেন্ট না হয় তখনই সেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। দেখা যায়, আমাদের প্লেট বাউন্ডারির লাইনগুলোতে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে। 

অনেক বিজ্ঞানী বলেন, সংঘর্ষের ফলে যদি এনার্জি রিলিজ হয়, তা হলে ভালো। আর যদি এনার্জি রিলিজ না হয়, যদি সেখানে প্লেট বাউন্ডারি থাকে তা হলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পরে যখন সেখান থেকে বড় ধরনের এনার্জি রিলিজ হয় তখন ভূমিকম্পের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের আশপাশে সক্রিয় তিনটি প্লেটের কারণে বলতে পারি যে, আমরা প্রবল ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে আছি, এটি নিশ্চিত।

আবহাওয়া বিজ্ঞানী আব্দুল মান্নান বলেন, এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পের প্রেডিকশন দেওয়ার মতো কোনো পদ্ধতি/প্রক্রিয়া আবিষ্কার হয়নি। যেহেতু এটি পৃথিবীর ইন্টারনাল বিহেভিয়ার এবং ইন্টারনালি লেট মুভমেন্ট এনার্জি রিলিজের মাধ্যমে এক প্লেট থেকে অন্য প্লেটে এনার্জি বিনিময় হয় বা কোনো কারণে যখন শক্তির পরিবর্তন হয়, তখনই ভূমিকম্পের মতো ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ কিন্তু ইউনিফর্মলি সৃষ্ট নয়। এখানে নন-উনিফর্মিটি আছে এবং সে কারণেই পৃথিবীর সব জায়গা সমানভাবে গঠিত হয় না। যেমন-জাপানে প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প হয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে সেভাবে ভূমিকম্প হয় না।

তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকে ব্যাপক ভূমিকম্প হয়েছে। তার মানে, আমরা ভূমিকম্প এরিয়ার মধ্যেই আছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঘন ঘন ভূকম্পন হচ্ছে কেন? যেহেতু এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, এখানে বছরের কোনো একসময় বা অতীতেও ভূমিকম্পের প্রবণতা ছিল, এখনও অতীতের মতো ভূমিকম্প প্রবণতা রয়ে গেছে। যেহেতু বাংলাদেশ ঝুঁকিতে আছে, সেহেতু বাংলাদেশের উচিত হলো অতীতের রেকর্ডগুলো আমলে নিয়ে যতটা সম্ভব সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ, এটি এমন একটি দুর্যোগ, যেটির কোনো পূর্বাভাস নেই। ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য আমাদের নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে।


আব্দুল মান্নান বলেন, টেকটোনিক প্লেটগুলো থাকার কারণে পৃথিবীর সব স্থান কিন্তু মুভ করছে। তবে, এ মুভমেন্টটা আমরা ফিজিক্যালি দেখি না। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি প্রতি বছর কিছু মিলিমিটার এটি মুভ করছে। সেই মুভমেন্টের কারণে বাংলাদেশও এখন দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। পৃথিবীর সব অঞ্চলই নিজস্ব প্লেটগুলোর মুভমেন্টের কারণে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এ মুভমেন্টের প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন। কাজেই নতুন কোনো এলাকায় ভূমিকম্প যে হবে না, সেরকম কোনো নিরাপত্তা আমরা পাচ্ছি না। এ নিরাপত্তা না থাকার কারণে যেসব অঞ্চল আমরা এ মুহূর্তে নিরাপদ ভেবেছিলাম, সেসব এলাকা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে বলা যায়, ভূমিকম্প মাসে তিনবার কেন, দিনেও তিনবার হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখনও এ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিজেদের কব্জায় আনতে পারেনি। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো এখনও কোনো দেশের বিজ্ঞানীরা মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে পারেনি। সেজন্য আমাদের সবার উচিত সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ভূতত্ত্ববিদ ও খ্যাতনামা ভূবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী বাংলাদেশ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বাংলাদেশের উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট, পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং পূর্বে হচ্ছে বার্মা প্লেট। তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। ইন্ডিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সেটি হচ্ছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের হাওড় হয়ে মেঘনা নদীর পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। যদি সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওড়টা দেখেন, তা হলে দেখবেন যে এটি উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত এবং মেঘনা নদীতে এসে পড়েছে। এটি দিয়ে যদি একটি কাল্পনিক রেখা টানেন তা হলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মেঘনা নদী হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান দিয়ে বার্মা ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগ ঘটেছে। 


অন্যদিকে এটির পূর্বে বার্মা প্লেট এবং পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট অবস্থিত। ইন্ডিয়ান প্লেট সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও মেঘনা নদীর লাইন বরাবর বার্মা থেকে নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে তলিয়ে যায় তখন আমরা বলি সাবডাকশন জোন। এ সাবডাকশন জোন সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তৃত।

তিনি বলেন, পৃথিবীর যত বড় বড় ভূমিকম্প সবই এ সাবডাকশন জোনে সংঘটিত হয়েছে। জাপান, চিলি, আলাস্কায় বড় বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। সেখানে যে ভূতাত্ত্বিক কাঠামো (সাবডাকশন জোন), একই কাঠামো আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত। সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্প খুবই ক্ষতিকারক। 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের সাবডাকশন জোন এবং এর আশপাশের অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। সেই ভূমিকম্পগুলো ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নদী-নালার গতিপথের পরিবর্তন এনেছে। ১৭৬২ সালের আসাম ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদীর দিকে চলে যায়। আগে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়েই এ নদের বেশিরভাগ পানি প্রবাহিত হতো।


এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বড় বড় ভূমিকম্প ভূপৃষ্ঠকে কোথাও উঁচু করে দেয়, আবার কোথাও নিচু করে দেয়। যেমন—চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল সৃষ্ট হয়েছে ভূমিকম্পের মাধ্যমে। দুটি প্লেটের পরস্পরমুখী সংঘর্ষ হলেই পাহাড়ের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া জনবসতিও স্থানান্তর করে ভূমিকম্প। বাংলাদেশের ইতিহাসে এগুলো আছে। অতীতে বাংলাদেশে বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে, এটি নিশ্চিত। যেমন১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পও ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়া ভূমিকম্পে ১ হাজার ৬২৭ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৭৬২ সালের ভূমিকম্প হয়েছিল সাবডাকশন জোনে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিলেট থেকে কক্সবাজার অঞ্চলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তিসম্পন্ন ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়ে আছে। এ শক্তি একবারে বের হতে পারে আবার ধীরে ধীরেও বের হতে পারে। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন সাবডাকশন জোনে যেসব ভূমিকম্প হয়েছে, সেগুলো থেকে ৬৫ থেকে ৮০ ভাগ শক্তি একবারে বের হয়েছে। বাকিটা ধীরে ধীরে বের হতে থাকে। একই রকম অবস্থা আমাদের এখানে বিরাজ করছে।

এর আগে ৮০০ থেকে ১ হাজার বছর আগে কুমিল্লার ময়নামতিতে ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্লেটগুলো জমাটবাঁধা শক্তি বের করেছিল। এরপরই নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে এ অবস্থায় এসেছে। তার মানে, ১ হাজার বছর ধরে শক্তি জমা হতে হতে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়েছে। এ শক্তিই যেকোনো সময় বের হয়ে আসতে পারে। 

গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পগুলো হয়েছে সাবডাকশন জোনের মধ্যে। এগুলোই বড় ভূমিকম্প হওয়ার আলামত। বড় ভূমিকম্প আজ হতে পার, কালও হতে পারে, আবার ৫০ বছর পরেও হতে পারে।

সরকার যদিও ২০০৮ সালে সিবিএমপির মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়েছে, কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয় বা তার ধারাবাহিকতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজটি করতে হবে। ঢাকা থেকে দূরে ভূমিকম্পের উৎস হলেও ঢাকাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তা হলে ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। যেহেতু আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই সেহেতু ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।

জেডও/

  বিষয়:   বাংলাদেশে ভূমিকম্প  ভূমিকম্প  উৎপত্তিস্থল  ঘোড়াশাল  নরসিংদী  মাধবদী  ইতিহাস  ঝুঁকি  আর্থকোয়েক 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: