জনশূন্য পাহাড়ে ব্যয়বহুল সড়ক

কিকিউ মারমা, বান্দরবান

সারাদেশ

বান্দরবানে ‘যৌথ খামার এলাকা থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন’ শীর্ষক টেন্ডার আহ্বান করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। প্রকল্প

2025-11-25T06:20:22+00:00
2025-11-25T06:20:22+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
জনশূন্য পাহাড়ে ব্যয়বহুল সড়ক
কিকিউ মারমা, বান্দরবান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫, ৬:২০ এএম 
জনমানবশূন্য পাহাড়ি এলাকায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে সড়কের নির্মাণকাজ। ছবি : সময়ের আলো
বান্দরবানে ‘যৌথ খামার এলাকা থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন’ শীর্ষক টেন্ডার আহ্বান করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। প্রকল্প অনুযায়ী জনবহুল এলাকায় ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়কের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। টেন্ডারে উল্লেখিত সড়ক বাদ দিয়ে সড়কের কাজ চলছে সম্পূর্ণ জনবসতিহীন পাহাড়ি এলাকায়। 

টাইগার পাড়া হয়ে সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত প্রায় জনমানবশূন্য পাহাড়ি এলাকায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে সড়কের নির্মাণকাজ। দীর্ঘ এই সড়কের দুই পাশে নেই কোনো গ্রাম, নেই স্কুল-কলেজ বা সরকারি স্থাপনা। 

স্থানীয়দের দাবি, এই সড়কটি সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না বরং এটি সুবিধা দেবে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন রিসোর্ট ও বাগানে যাতায়াতে। এভাবে সরকারি অর্থের অপচয় এবং উন্নয়নকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের শুরুতে টাইগার পাড়ায় প্রায় ৭০টি পরিবার বসবাস করলেও এরপরের প্রায় ৩ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নির্মাণাধীন রিসোর্ট। সড়কের আশপাশে নেই কোনো জনবসতি। নির্জন পাহাড়ি পথে অযথাই সড়ক নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। টাইগার পাড়া থেকে রুপালি ঝরনা ও সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে মাটি সমান করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় পাহাড় কেটে সাইড ওয়ালের পাশে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। পুরো সড়কজুড়ে পাহাড় কাটার দৃশ্য স্পষ্ট।

পাহাড় কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, সড়ক নির্মাণে পাহাড় কাটার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমি বান্দরবানে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করছি। এই সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠান পাহাড় কাটার অনুমতি নেয়নি। এর আগে অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না তা যাচাই করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক উন্নয়নে কিছু কাটাকাটি হয়, তবে তার জন্য পরিবেশ অধিদফতরের লিখিত অনুমতি অবশ্যই প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর বলেন, পার্বত্য জেলাগুলোর সিস্টেম হলো আগে রাস্তা নির্মাণ করা হয়, পরে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে যে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে তা টাইগার পাড়া ও রুপালি ঝরনা হয়ে রেইচা মেইন সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। রাস্তাটি হলে রেইচার দিক দিয়েও যাতায়াত করা যাবে, আবার টাইগার পাড়ার দিক দিয়েও যাওয়া যাবে। 

তিনি আরও বলেন, সড়কের পাশে কারও ব্যক্তিগত রিসোর্ট বা কোনো নেতার বাগান রয়েছে কি না তা আমার দেখার বিষয় নয়। এ সড়কটি ২০১৩ সালেই এলজিইডির গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে একটা ভুল হয়েছে। রাস্তার নাম যৌথ খামার-টাইগার পাড়া রাখা ঠিক হয়নি। রাস্তার নাম হওয়া উচিত ছিল টাইগার পাড়া-রুপালি ঝরনা-রেইচা প্রধান সড়ক। এই দুই সড়কে দুটি আইডি রয়েছে। আইডি অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর।

এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২৪ সালে ৪ ডিসেম্বর যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়কের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ টাকা। কাজের দায়িত্ব পায় হিমু কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। 

সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, টেন্ডারে জনবহুল এলাকার নাম ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে সম্পূর্ণ জনবসতিহীন অঞ্চলে। যেখানে নেই কোনো গ্রাম, নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনকি সরকারি-বেসরকারি কোনো স্থাপনাও নেই। তাদের দাবি, সড়কটি নির্মিত হলে এর সুফল মূলত ভোগ করবে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন রিসোর্ট ও বাগান। সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসবে না এই সড়ক। এর মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় হওয়ার পাশাপাশি উন্নয়নের নামে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

টাইগার পাড়ার বাসিন্দা কালাচাং তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ চলাচল করেন এই রাস্তায়। অসংখ্য গর্তে ভরা এই সড়কটির সংস্কার না করে বরাদ্দের টাকায় কাজ করছে জনশূন্য এলাকায়। এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সোহেল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, টাইগার পাড়া থেকে রুপালি ঝরনা পর্যন্ত সড়কের পাশে নেই কোনো গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি স্থাপনা। 

তিনি বলেন, রুপালি ঝরনায় যেতে মানুষ কখনোই এই সড়ক ব্যবহার করে না। রেইচা বাজারের প্রধান সড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার গেলেই ঝরনায় যাওয়া যায়। তাই নতুন এই সড়ক নির্মাণ টাকা অপচয় ছাড়া আর কিছুই না। এটা স্থানীয়দের কোনো কাজেই আসবে না।

এফআর


  বিষয়:   বান্দরবান  জনমানবশূন্য পাহাড়ি এলাকা  কোটি টাকা ব্যয়ে  সড়ক নির্মাণকাজ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: