বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে আগ্রহ। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যে ইসিতে মনোনয়ন জমা দিতে হবে। এখনও ভোটার না হওয়ায় মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই তারেক রহমানকে দেশে ফিরতে হবে। দলীয় এবং সরকারি একাধিক সূত্রের দাবি, ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখে দেশে ফিরতে পারেন তিনি।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার চলাচলের বহরে থাকার জন্য দলের ত্যাগী আর সাহসী নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে একটি টিম গঠনও প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে দলীয়ভাবে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এসে তিনি কোথায় উঠবেন এবং কোথায় অফিস করবেন তাও চূড়ান্ত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিরাপত্তার বিষয় নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছে দলের একটি প্রতিনিধি দল। এ ছাড়া খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্বাচনি প্রচারের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখে দুটি বুলেটপ্রুফ বাস ও গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। সরকারের অনুমতি পাওয়ার পর গাড়ি ইতিমধ্যে চলে এসেছে বলে দাবি সূত্রের। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্যও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছে বিএনপি।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের দেশে ফিরতে কোনো বাধা নেই। তিনি ডিসেম্বরের ৭ বা ৮ তারিখে দেশে ফিরতে পারেন। তার নিরাপত্তার জন্য যা যা চাওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশে ফিরতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত তারেক রহমানের ফেরার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। এটা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও কাটেনি। দলের পক্ষ থেকে জানানো হলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেবে সরকার। তার দেশে ফেরার সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার জন্য আটকে আছে।
দলীয় সূত্র বলছে, গুলশান-২-এর ‘ফিরোজা’ ভবনে থাকেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এর পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তৎকালীন সরকার তার স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেয়। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার গুলশান-২ অ্যাভিনিউ রোডের ১৯৬ নম্বর বাড়ির নামজারি সম্পন্ন করে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র খালেদা জিয়ার হাতে হস্তান্তর করেছে। বাড়িটি এতদিন ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ-এর কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল। দেশে ফিরে এই বাড়িতেই থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। ইতিমধ্যে তার থাকার জন্য বাড়িটি উপযোগী করে তুলতে সাজসজ্জা করা হয়েছে, লাগানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স।
এ ছাড়া দেশে ফিরে তারেক রহমান ধানমণ্ডির ৫ নম্বর সড়কের ‘মাহবুব ভবন’-এ উঠতে পারেন বলেও দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তারেক রহমানের শ্বশুর সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়াল অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের বাসভবন এটি। এখানে থাকার সম্ভাবনা কম।
বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়েই তারেক রহমান অফিস করবেন। এ জন্য তার বসার উপযোগী করেই কক্ষটি সাজানো হয়েছে। আর তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর (সিএসএফ) সদস্যরা। ইতিমধ্যে কয়েকজন সদস্য এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের ফেরার বিষয়ে নানা কারণে গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। দলের অনেক সিনিয়র নেতাও জানেন না কবে ফিরবেন তিনি। তবে তার আসার কয়েক দিন আগে বিষয়টি প্রকাশ পাবে। তিনি যে দিন ফিরবেন সেদিন লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে রাজধানীতে জড়ো হবেন। দিনটি বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন হবে। সেদিনই বিএনপির নির্বাচনি প্রচার অর্ধেকের বেশি হয়ে যাবে। দেশে ফেরার আগে ওমরাহ হজ পালনের কথা থাকলেও এখন তা আর হচ্ছে না। লন্ডন থেকে সরাসরি দেশে ফিরবেন তিনি। তিনি দেশে এলে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হবে, সেটিও মাথায় রেখে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। সে সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ছিলেন লন্ডনে। জুবাইদা রহমান সম্প্রতি দেশে ফিরে ভোটার হলেও তারেক রহমানের ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ড নেই। লন্ডন থেকেও তিনি তা সংগ্রহ করেননি। এখন পর্যন্ত তিনি নির্বাচন কমিশনেও আবেদন করেননি। দেশে ফিরেই তিনি ভোটার হবেন। ছবি যুক্ত ভোটা আইডি কার্ড নিতে হলে আবেদনকারীর স্বাক্ষর, ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ বাধ্যতামূলক। ফলে কোনো প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এরপরও নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে ভোটার হতে পারবেন তিনি। তবে তিনি যেহেতু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তাই নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন পত্র দাখিলের আগেই তাকে ভোটার হতে হবে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের নিবন্ধন ও প্রবাসী শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারেক রহমান চাইলে লন্ডনে বসেই ভোটার হতে পারতেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারেক রহমান লন্ডনে ভোটার হবেন না। তিনি বাংলাদেশে এসেই ভোটার হবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে ভোটার হয়েছেন কি না আমরা জানি না। প্রাপ্তবয়স্ক কেউ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তিনি যেকোনো সময় ভোটার হতে পারবেন। তবে ভোটার হওয়ার জন্য বায়োমেট্রিক প্রয়োজন হওয়ায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। যারা ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ১৮ বছর হয়েছে তারা নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে যারা বাদ পড়েছেন নির্বাচনের আগে তাদের আর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যাদের বয়স বেশি বা আগে ভোটার ছিলেন, এদের মধ্যে যারা বাদ পড়েছেন তারা ভোটার হতে চাইলে নির্বাচন কমিশন তাদেরকে সুযোগ দেবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সেই এলাকার সাপ্লিমিন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। যিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন তাকে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই ভোটার হতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই জানেন, তিনি কবে দেশে ফিরবেন। সিদ্ধান্ত হলে আপনাদের জানানো হবে। তবে তার দেশে ফেরার বিষয়ে আমরা সবসময়ই প্রস্তুত রয়েছি।
প্রায় ১৭ বছর ধরে লন্ডনে আছেন তারেক রহমান। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ এক-এগারোর জরুরি জমানায় তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। পরের বছরে ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে যান তিনি। এরপর সেখান থেকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
সময়ের আলো/এনএ