কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ভাসছে মৃত জেলিফিশে

ইমরান হোসাইন, চকরিয়া (কক্সবাজার)

সারাদেশ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় প্রতিদিনই ভেসে আসছে বিপুলসংখ্যক মৃত জেলিফিশ। গত এক মাসে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, নাজিরারটেক হিমছড়ি ও

2025-11-28T01:19:48+00:00
2025-11-28T01:19:48+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ভাসছে মৃত জেলিফিশে
ইমরান হোসাইন, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ১:১৯ এএম 
গত এক মাসে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে দেড় হাজারেরও বেশি মৃত জেলিফিশ তীরে ভেসে এসেছে। ফাইল ছবি
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় প্রতিদিনই ভেসে আসছে বিপুলসংখ্যক মৃত জেলিফিশ। গত এক মাসে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, নাজিরারটেক হিমছড়ি ও ইনানী সৈকতে দেড় হাজারেরও বেশি জেলিফিশ তীরে ভেসে এসেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণ দল ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)। প্রতিদিন সকালে সৈকতের বালুচরে ছড়িয়ে থাকা নীলচে স্বচ্ছ শরীরের এসব প্রাণী দেখে কৌতূহলী হচ্ছেন পর্যটকরা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রকৃতির এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা যা জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব নির্দেশ করছে।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, কমছে অক্সিজেন : বাংলাদেশ মহাসাগর গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। নরমদেহী প্রাণী হিসেবে জেলিফিশের জন্য এটি মারাত্মক। উষ্ণ ও কম অক্সিজেন যুক্ত পানিতে টিকে থাকতে না পেরে তারা ঢেউয়ের সঙ্গে তীরে ভেসে আসে। তীরে আসার পথে এবং আসার পর তাদের মৃত্যু ঘটে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, সমুদ্রের উষ্ণতা ও অক্সিজেন ঘাটতির কারণে জেলিফিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। তারা সাগরের গভীরে টিকে থাকতে না পেরে উপকূলে চলে আসে যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে সাগরের রাসায়নিক ভারসাম্য : বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সাগরের পানির অমøত্ব (পিএইচ) ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত দশ বছরে বঙ্গোপসাগরে পানির অম্লত্ব বেড়েছে। বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড পানিতে মিশে গিয়ে এই অমøতা বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক তুরাবুর রহমান বলেন, অমøত্ব ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি জেলিফিশের প্রজনন কোষ ও শরীরের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে তারা প্রজননে অক্ষম হচ্ছে এবং বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাচ্ছে।

মানবসৃষ্ট দূষণের ভয়াবহ প্রভাব : ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, কক্সবাজার সৈকতে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ টন প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য জমে। পর্যটকদের ফেলে দেওয়া বোতল, ফোম ও মোড়ক ঢেউয়ের সঙ্গে সমুদ্রে ভেসে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণীদের খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। জেলিফিশ প্রজাতি এই বর্জ্যকে খাবার ভেবে গ্রহণ করে এবং তা হজমে ব্যর্থ হয়ে মারা পড়ে। কক্সবাজার মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রায়ই মৃত জেলিফিশের শরীরে প্লাস্টিকের ছোট টুকরো লেগে থাকতে দেখি। এটি দূষণের সরাসরি প্রমাণ।

প্রাকৃতিক চক্র, নাকি পরিবেশগত অস্বাভাবিকতা : সাধারণত বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কিছু জেলিফিশ উপকূলে আসে যা প্রাকৃতিক চক্রের অংশ। তবে বর্তমানে এর ব্যাপকতা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতি মাসে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি জেলিফিশ তীরে ভেসে আসত। আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা সমুদ্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতিমাত্রায় মাছ ধরা, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রম এই ভারসাম্য আরও নষ্ট করছে।

তথ্য যা বলছে : তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ২৭ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই সময়ে সাগরের অম্লত্ব বেড়েছে, দূষণও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। ২০১৮ সালে সৈকতে ভেসে আসা মৃত জেলিফিশের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি, ২০২১ সালে ৮০০টি আর ২০২৫ সালে তা ছুঁয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূলে বার্ষিক প্লাস্টিক বর্জ্য জমার পরিমাণ ২০১৫ সালে ছিল ১ হাজার ২০০ টন। ১০ বছরের ব্যবধানে সেই পরিমাণ বেড়ে ৩ হাজার টনে গিয়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ বৃদ্ধি এবং জেলিফিশ মৃত্যুহার বৃদ্ধির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

পর্যটন ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি : সৈকতে মৃত জেলিফিশের ভিড়ে অনেক পর্যটক আতঙ্কিত। কেউ কেউ অজান্তে জেলিফিশ স্পর্শ করে ত্বকে জ্বালা-পোড়া অনুভব করেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সতর্কতামূলক ঘোষণা দিয়েছে এবং সৈকতে মৃত জেলিফিশ দ্রুত অপসারণে পরিচ্ছন্নতা টিম নিয়োজিত রয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় করণীয় : পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ এখনই নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা চালানোর পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত সৈকত এলাকায় কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ও সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংসকারী কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ কমিয়ে অন্তত সামুদ্রিক প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। কক্সবাজার সৈকতে মৃত জেলিফিশের ভেসে আসা নিছক কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ এবং পরিবেশগত চাপ এবং মানবসৃষ্ট দূষণের কারণে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে একদিন হয়তো জেলিফিশের সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের উপকূলের জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সময়ের আলো/কেএইচও

  বিষয়:   কক্সবাজার  সমুদ্রসৈকত  মৃত  জেলিফিশ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: