আজ ৮২ বছরে পা দিলেন বাংলাদেশের খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, মুক্তচিন্তার প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুন নবী। শিল্পী রনবী, যিনি সারা দেশে ‘রনবী’ নামেই বেশি পরিচিত, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রকৃতি, সমাজ, রাজনীতি এবং মানবতার গভীর বাস্তবতা। আজকের এই বিশেষ দিনে, আমরা তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তার শিল্পীসত্তার উজ্জ্বল উত্তরাধিকার এবং তার সমৃদ্ধ সৃষ্টিশীলতাকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখার জন্য।
শৈশব এবং শিক্ষা
রফিকুন নবী ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা, রশীদুন নবী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান। বাবার বদলির চাকরির কারণে রফিকুন নবী দেশের নানা অঞ্চলে বেড়ে ওঠেন, যা তাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃতি ও সমাজজীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। এই অভিজ্ঞতা তার শিল্পীসত্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে চিত্রকলায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি দীর্ঘকাল এই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করেন, যার মাধ্যমে তিনি পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে কৌশল এবং দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ রেখে গেছেন।
চিত্রকর্মে প্রকৃতির সত্তা
রফিকুন নবীর চিত্রকলার ভাষা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং তার কাজে প্রকৃতি, মানুষ, গ্রামীণ জীবন, নদী, আকাশ, এবং পশুপাখির চিত্র উঠে এসেছে। তার শুরুর দিকের কাজগুলোতে তিনি জলরঙের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতির শান্তিপূর্ণ সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। নদী, নৌকা এবং খোলা আকাশে প্রকৃতির ঐশ্বর্য তার ছবিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে তেলরঙ এবং অ্যাক্রিলিকের মাধ্যমে তার কাজ আরও শক্তিশালী এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার ছবিতে রঙ, রেখা এবং আকারের মাধ্যমে তিনি মানব জীবনের সংগ্রাম, আনন্দ এবং বিশ্রামের মুহূর্তগুলো তুলে ধরেন। এক বিশেষ অনুষঙ্গ হিসেবে, মহিষ ও ছাগল তার ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসে, যা শুধুমাত্র প্রকৃতির অংশ নয়, বরং বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার গভীর চিত্রকেই তুলে ধরে।
সমাজের কণ্ঠস্বর
রফিকুন নবীর সৃষ্টির অন্যতম অনন্য দিক হলো তার বিখ্যাত কার্টুন চরিত্র ‘টোকাই’। ১৯৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়া এই চরিত্রটি বাংলাদেশের নিম্নবর্গের অবহেলিত শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে টোকাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ব্যতিক্রমী এবং গভীর। তিনি সমাজের অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসেন। টোকাইয়ের কৌতুক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে রফিকুন নবী ক্ষমতাসীন শাসকদের অন্যায় এবং দুর্নীতির সমালোচনা করেছিলেন, যা সমাজে সচেতনতা ও পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে।
টোকাই শুধুমাত্র একটি কার্টুন চরিত্র নয়, বরং বাংলার শিল্প-ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। তার মাধ্যমে রফিকুন নবী শিল্পের মাধ্যমে সমাজের সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে নজর দিয়েছেন।
শিল্পী হিসেবে রফিকুন নবী
রফিকুন নবীর সৃষ্টিকর্ম শুধুমাত্র শিল্পকলা ও কার্টুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক চেতনায় একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছেন। তার কাজগুলোর মধ্যে দেখা যায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যা জীবনের সৌন্দর্য এবং আশাবাদী মনোভাবের প্রতিফলন। যদিও তার চিত্রকর্মে প্রতিবাদ ও সমালোচনাও রয়েছে, তবুও তিনি কখনও জীবনের দুঃখকে প্রশ্রয় দেননি, বরং তার সৃষ্টিতে সব সময় আনন্দ, উল্লাস, এবং জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে।
শিক্ষাবিদ এবং সংস্কৃতিকর্মী
রফিকুন নবী শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন, তিনি একজন শিক্ষাবিদ এবং সংস্কৃতিকর্মীও। দীর্ঘকাল ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক হিসেবে তিনি শিল্পের নতুন ধারার প্রচলন এবং শৈল্পিক সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। তার ছাত্র-ছাত্রীরা আজও তার কাছে শেখা শিল্পচর্চা এবং দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে নিজেদের পেশাগত জীবনে সফল।
আজও এক অনুপ্রেরণা
এখন ৮২ বছর বয়সে এসে রফিকুন নবী জীবনবাদী, সাহসী, এবং মানবিক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। তার চিত্রকর্ম এবং ভাবনা আজও আমাদের জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। তিনি আমাদের শেখান কিভাবে জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো উপলব্ধি করতে হয়, কিভাবে সমাজের প্রতি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হয়, এবং কিভাবে প্রতিটি মুহূর্তকে গভীরভাবে অনুভব করতে হয়।
শিল্পী রফিকুন নবী আজও আমাদের সবার কাছে এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যার সৃষ্টি এবং চিন্তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার জন্মদিনে তাকে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
/ইউএমএইচ