
ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির করিডোরে প্রবেশ করলেই এই ডিসেম্বরের শুরুতে চোখে ভাসবে এক ভিন্ন আলো। গ্যালারি–৫–এ দুই দিনের জন্য সাজানো হচ্ছে এমন এক প্রদর্শনীর আয়োজন, যা রঙ ও রেখার মাধ্যমে তুলে ধরবে সমাজের প্রান্তে বড় হওয়া শিশুদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং গভীর মানবিকতার গল্প। গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এবং সেন্ট্রোটেক্স লিমিটেড যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করছে বিশেষ শিল্প প্রদর্শনী ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’, যেখানে যৌনকর্মীর সন্তানদের কল্পনার পৃথিবীকে রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাদের হাতে আঁকা ছবি, কারুশিল্পের মাধ্যমে।
বছরের পর বছর সমাজের চোখ এড়িয়ে, অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে বড় হচ্ছে এসব শিশু। তাদের বাস্তব জীবনে নেই কোনো রঙিন খাতা বা নির্বিঘ্ন শৈশবের নিশ্চয়তা। কিন্তু রঙতুলি হাতে পেলেই তারা গড়ে তোলে নিজের মতো করে এক স্বপ্নের মানচিত্র। এবার সেই মানচিত্রই খুলে যাচ্ছে সাধারণ দর্শকের সামনে। প্রদর্শনীর থিম “ড্রিম হোম”—যে ঘর হয়তো তারা কখনো পায়নি, কিন্তু মন ভরে কল্পনা করেছে প্রতিটি মুহূর্তে। কেউ এঁকেছে নিরাপত্তায় ঘেরা নরম আলোয় ভরা ঘর, কেউবা খোলা আকাশের নিচে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা জানালার ছবি। কারও কারও চিত্রে দেখা যাবে মায়েদের মুখ—যে মুখ সমাজের কাছে অপরাধ, কিন্তু শিশুদের কাছে আশ্রয়ের আরেক নাম।
গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন প্রায় এক দশক ধরে তাদের ‘প্রজেক্ট পথচলা’র মাধ্যমে এই শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে সংস্থার আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছে ৪২ জন শিশু, যাদের মধ্যে ২৪ জন নিয়মিত স্কুলে যায়। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তারা লড়ে যায় নিজের মতো করে, আর সেই লড়াই, সেই স্বপ্ন, সেই স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষাই ফুটে উঠবে এই প্রদর্শনীতে। দুই দিনের এই আয়োজনের উদ্বোধন হবে ৫ ডিসেম্বর বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে, আর সমাপনী অনুষ্ঠান ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায়।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট এবং ‘উন্মাদ’ সম্পাদক আহসান হাবীব, যিনি তার দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় সবসময় নতুন সৃষ্টির প্রতি উৎসাহ জুগিয়েছেন। সমাপনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিইপিআরসি-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, কূটনীতিক, উন্নয়নকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেবেন এই মানবিক আয়োজনে, যাদের উপস্থিতি শিশুদের অনুপ্রেরণার আরেক উৎস হয়ে উঠবে।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে দেশ গঠনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং মৌলিক চাহিদাপূরণে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি প্রতিফলিত হয়েছে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্য। সেই পরিবর্তনের যাত্রাতেই যুক্ত হয় এই প্রদর্শনী, যেখানে শিল্প হয়ে ওঠে সামাজিক সচেতনতার ভাষা।
‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’ প্রদর্শনী তাই শুধু শিল্পের উৎসব নয়, এটি এমন এক জানালা, যার ওপাশে দেখা যায় অসম্ভব প্রতিকূলতার মাঝেও বেড়ে ওঠা শিশুদের আশা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। রঙের নরম আঁচড়ে তারা এঁকেছে নিজেদের পৃথিবী—যা দর্শককে ভাবাবে, নাড়া দেবে এবং মানবিকতার প্রতি নতুন করে বিশ্বাস জাগাবে।
/ইউএমএইচ