ঢাকার রাস্তায় কখনও এক লম্বা চিত্রগ্রাহক মিছিল, কখনও গ্রামের কাদা-মাটির পথ, যেখানে সিনেমা পৌঁছানোর জন্য পাড়ি দিতে হবে সংগ্রামের পথ। সেই পথে হেঁটেছিলেন এক তরুণ পরিচালক, যার চোখে ছিল সমাজ ও মানুষের গল্প, যার মন পড়েছিল সিনেমার প্রতি অগাধ ভালোবাসায়। তিনি আর কেউ নন, তারেক মাসুদ, যাকে সিনেমার ফেরিওয়ালা নামে সবাই চেনে। তারেকের জীবন ছিল সিনেমা আর বার্তার এক অবিচ্ছেদ্য যাত্রা, যা কখনো থেমে থাকেনি, এমনকি আমেরিকার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে এসে তিনি বেছে নেন সিনেমাকে প্রচারের এ সংগ্রামী পথ।
আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত এই চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার তারেক মাসুদ। বেঁচে থাকলে এবার তিনি ৬৯ বছর পূর্ণ করতেন।
তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গা নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবা মশিউর রহমান মাসুদ। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা শুরু হয় মাদ্রাসায়, পরে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তার আসল আগ্রহ ছিল চলচ্চিত্র নির্মাণ।
চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন না। তিনি সিনেমার মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরতেন। তিনি নিজের ছবিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে কাদা-মাটি-জল পার করে হেঁটেছেন।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক। তার ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিনের সঙ্গে কাজ করে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের সংগ্রামী গান ক্যামেরায় ধারণ করেন। ‘নারীর কথা’, ‘ইন দ্য নেইম অব সেফটি’, ‘ভয়েসেস অফ চিলড্রেন’ সিনেমাগুলো সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও মানবাধিকার বিষয় তুলে ধরেছে। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘সোনার বেড়ি’, ‘সে’, ‘নরসুন্দর’, ‘শিশু কথা’, ‘নিরাপত্তার নামে’, এবং এনিমেশন ‘ইউনিসন’।
তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ (২০০২) আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রশংসিত হয়। এটি কান, এডিনবার্গ, মন্ট্রিয়াল ও কায়রো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার প্রতিযোগিতায় বিদেশি ভাষার বিভাগে মনোনীত হয়। পরবর্তী সময়ে নির্মাণ করেন ‘অর্ন্তযাত্রা’ (২০০৬) ও ‘রানওয়ে’ (২০১০)।
তারেক মাসুদ সবসময় সমাজ সচেতন ও বাস্তবধর্মী সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত বিলাসিতা ত্যাগ করে সিনেমার জন্য সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। নিজের বানানো ছবিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে কাদা-মাটি পার হয়ে হেঁটেছেন। তাই তাকে বলা হতো ‘সিনেমার ফেরিওয়ালা’।
২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট, নতুন ছবি ‘কাগজের ফুল’ নির্মাণের জন্য মানিকগঞ্জে যাওয়ার পথে এক মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় তিনি প্রয়াত হন। তার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন বন্ধু চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন।
প্রতি বছর তার জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি সংগঠনগুলো তাকে স্মরণ করে নানা আয়োজন করে। তার কাজ ও দর্শন বাংলা চলচ্চিত্রে চিরসবুজ হয়ে থাকবে। তিনি প্রমাণ করেছেন, চলচ্চিত্র শুধুই বিনোদন নয়, সমাজ সচেতনতা ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম।
আজকের দিনে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা তাকে স্মরণ করে বলবে, তারেক মাসুদ ছিলেন সিনেমার ফেরিওয়ালা, যিনি সিনেমার মাধ্যমে সমাজ-সংস্কারের বার্তা ছড়িয়ে দিতেন।
/ইউএমএইচ