মিষ্টি পানির সংকটে চর আতাউরের বাসিন্দারা

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

পানি মানেই দুশ্চিন্তা, পানি মানেই সংগ্রাম, আর পানি মানেই রোগ ব্যাধির আশঙ্কা। বিশাল সমুদ্রের পাশে থেকেও এই চরের মানুষ আজ

2025-12-09T20:07:44+00:00
2025-12-09T20:07:44+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মিষ্টি পানির সংকটে চর আতাউরের বাসিন্দারা
গর্তের পানি-ই শেষ ভরসা
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৮:০৭ পিএম 
জমে থাকা গোলা পানিতে ঘরের অসবাপত্র পরিষ্কার করছেন। ছবি : সময়ের আলো
পানি মানেই দুশ্চিন্তা, পানি মানেই সংগ্রাম, আর পানি মানেই রোগ ব্যাধির আশঙ্কা। বিশাল সমুদ্রের পাশে থেকেও এই চরের মানুষ আজ পানির জন্য হাহাকার করছে। পুকুর শুকিয়ে কাঠ, নলকূপ বিকল, আর নদীর লোনা পানি ব্যবহারে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আক্রান্ত ত্বকের নানান রোগে। জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতায় মানুষ এখন বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছে নতুন এক উপায়।

ঘরের সামনে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে সেখানে জমে থাকা সামান্য গোলা পানি ব্যবহার করা। একই পানিতে তারা থালাবাসন ধোয়, কাপড় কাচে, গোসল করে; এমনকি রান্নার কাজেও কখনো ব্যবহার করতে হয়। সেই পানি পান করে তাদের গৃহপালিত পশু পাখিরাও বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।

এই দৃশ্য নোয়াখালী হাতিয়ার চর আতাউরে। এই চরে দুটি গুচ্ছগ্রাম ও একটি ব্যারাক হাউজে প্রায় চার শত লোকের বসবাস। তাতে সরকারিভাবে দুটি বড় পুকুর খনন করা হয়। অস্বাভাবিক জোয়ারে পুকুরের পাড় ভেঙে পানি ডুকে পড়ে। তাতে পলি জমে জমে পুকুর গুলো সমতলের মতো হয়ে যায়। এখন আর পানি জমে না এই পুকুর গুলোতে। এছাড়া এসব বাসিন্দাদের জন্য চারটি গভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে তিনটি অনেক আগে বিকল হয়। এর মধ্যে একটি আছে কোন মতে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য মানুষজনকে নদীর লোণা পানি সহ বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়।

স্বাভাবিক ভাবে জমে যাওয়া গোলা পানিতে ঘরের অসবাপত্র পরিষ্কার করছেন এক গৃহিনী। ছবি : সময়ের আলো

স্বাভাবিক ভাবে জমে যাওয়া গোলা পানিতে ঘরের অসবাপত্র পরিষ্কার করছেন এক গৃহিনী। ছবি : সময়ের আলো


সরেজমিনে তরুবীতি গুচ্ছ গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, মধ্য বয়সি এক গৃহিনী ঘরের সামনে একটি গর্তের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে জমে যাওয়া গোলা পানিতে ঘরের অসবাপত্র পরিষ্কার করছেন। অল্প পানিতে থালাবাসন ভালোভাবে পরিষ্কার হয় কি না জানতে চইলে তিনি বলেন, কিছুই করার নেই। নদীর লোনা পানির চেয়ে অনেক ভালো গর্তের এই পানি। লোনা পানি ব্যবহারে শরীরে এলার্জি সহ নানা রোগ দেখা দিয়েছে। এজন্য ঘরের সামনে পুকুরের মধ্যে গর্ত তৈরি করে নিয়েছেন। তাতে দৈনন্দিন ব্যবহার, গোসল, রান্নার কাজে ব্যবহার সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীতা মিটাতে হয়।

অজিফা নামের এই গৃহিনী আরও বলেন, ৭ বছর আগে আমরা এখানে বসবাস শুরু করি। তরুবীথি ও ছায়াবীথি নামে এই দুটি গুচ্ছ গ্রামে দুই শতাধিক লোকের বসবাস ছিল। সবার জন্য চারটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময় তিনটি একেবারে বিকল হয়ে গেছে, এখন একটি নলকূপে কোনোমতে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা যায়। তাও মাঝে মধ্যে বিকল হয়ে থাকে।

একই দৃশ্য দেখা যায় পুকুরে উত্তর পাশে। আফিয়া খাতুন নামে একজন গর্তে নেমে নিজেদের পরিবারের জামাকাপড় পরিষ্কার করছেন। ৫ ফুট দৈর্ঘ ৫ প্রস্থ এই গর্তের মধ্যে গোলা পানিতে তিনি পরিষ্কার করার কাজ করছেন। আফিয়া জানান, একটি মাত্র পানির কল আছে। তাতে সবাই গোসল ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করলে অল্প সময়ের মধ্যে তা একেবারে বিকল হয়ে যাবে। এজন্য ঘরের সামনে পুকুরের মধ্যে গর্ত করে নিয়েছেন। তাতেই পারিবারিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। মাঝে মধ্যে হাটু সমান এই পানিতে গোসল পর্যন্ত করতে হয়।

গুচ্ছ গ্রামের উত্তর পাড়ে বসবাস করেন লিপি রানী দাস নামে একজন। পেশায় জেলে হলেও চরে থেকে ৭-৮টি গরু পালেন তারা। নদীতে এখন লোনা পানি। গরু ছাগল এই পানি পান করতে পারে না। এজন্য মিস্টি পানির প্রয়োজন হয়। পুকুরে পানি নেই। উপায় না পেয়ে ঘরের পাশে গর্ত করে নিয়েছেন। তাতে জমে থাকা পানি নিজেরা ও ব্যবহার করেন। আবার গরু ছাগলও পান করে।

তিনি আরও জানান, এখন শীত মৌসুম শুরু হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিছুদিন পর গর্তের পানি শুকিয়ে যাবে। তখন গরু ছাগল ও নিজেদের প্রয়োজন মিটানো অনেক কঠিন হবে বলে জানান তিনি।

গর্তে নেমে নিজেদের পরিবারের জামাকাপড় পরিষ্কার করছেন এক গৃহিনী। ছবি : সময়ের আলো

গর্তে নেমে নিজেদের পরিবারের জামাকাপড় পরিষ্কার করছেন এক গৃহিনী। ছবি : সময়ের আলো


শুধু লিপি, আফিয়া বা হাজেরা নয়। তরুবীথি ও ছায়াবীথি দুটি গুচ্ছ গ্রামের অনেকে নিজেদের প্রয়োজনে ঘরের সামনে গর্ত করে নিয়েছেন। সেই গর্তের পানি তাদের একমাত্র ভরসা।

চর আতাউরের বাসিন্দা খোকন মাঝি জানান, সরকার ভূমিহীনের বসবাসের জন্য এই চরে দুটি গুচ্ছগ্রাম ও একটি ব্যারাক হাউজ তৈরি করেছেন। ব্যারাক হাউজে কোনো পুকুর না থাকলেও গুচ্ছগ্রাম দুটিতে বিশাল দুটি পুকুর খনন করা হয়। সেই পুকুর গুলো এই চরে বসবাস করা চারশত পরিবার ও দুই সহশ্রাধিক গরু মহিষের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু চার বছর আগে জোয়ারের স্রোতে পাড় ভেঙে পুকুর গুলো সমতল হয়ে যায়। এর মধ্যে অনেক গুলো নলকুপও বিকল হয়ে যায়। তাতে মিস্টি পানির জন্য চরে একধনের হাহাকার পড়ে যায়। নদীর লোনা পানি ব্যবহারে মানুষের মধ্যে চর্ম রোগ দেখা দেয়। সরকারি ভাবে এখানে মানষের বসবাস এর ব্যবস্থা করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বারবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ সবার কাছে আবেদন করেও কোন ফল পাওয়া যায় নি।

এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, হতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরআতাউরে বসবাস করা ভূমিহীনদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ করছি। তাদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। সেখানে মিস্টি পানির সংকট আছে। আমরা ইতিমধ্যে সেখানে নতুন একটি পুকুর খনন করার জন্য চিন্তা করছি। এছাড়া আগের পুকুর গুলো পুনরায় খনন করার বিষয়ে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   গর্ত  পানি  ভরসা  মিষ্টি  পানি  সংকট  চর আতাউর  বাসিন্দা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: