রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোলসহ নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলায় পানির স্তর ক্রমাগত নামছে। পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সিদ্ধান্ত নেয়—তারা নতুন করে আর কোনো গভীর নলকূপ বসাবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা আর গভীর নলকূপ বসাচ্ছেও না।
কিন্তু ব্যক্তি মালিকানায় অগভীর নলকূপ (সেমিডিপ) বসানোর কাজ থেমে নেই।
নলকূপ স্থাপনের সময় পানি পেতে একাধিক জায়গায় খননের প্রয়োজন পড়ে। এভাবে তৈরি হয় গভীর গর্ত যার অধিকাংশই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এ রকম শত শত পরিত্যক্ত গর্ত রয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। যেগুলোর ব্যাসার্ধ ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি। শুধু সেচের পানি বিক্রির জন্য মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছেন অর্থলোভী প্রভাবশালীরা।
সম্প্রতি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ওয়ারপো) সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভায় রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলাকে অতি উচ্চ পানিসংকট এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও থেমে নেই অগভীর নলকূপ বসানোর কাজ। নামতে নামতে একটা সময় আর পানিই পাওয়া যাচ্ছে না। তখন অগভীর নলকূপ (সেমিডিপ) তুলে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। আর এতেই তৈরি হচ্ছে মৃত্যুফাঁদ।
এই মৃত্যুফাঁদেরই বলী তানোর উপজেলার কোয়েলহাট গ্রামের শিশু সাজিদ। শিশু সাজিদ গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যাওয়ার পরপরই আত্মগোপনে চলে যান কছির উদ্দিন। তিনিই মূলত এই নলকূপ খুঁড়েছিলেন। তার আপন বড় ভাই পাঁচন্দর ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির আব্দুল করিমকেও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, কছির উদ্দিন আগে বিদেশে ছিলেন। দেশে ফেরার পর পানির ব্যবসা শুরু করেন। এলাকায় পাঁচটি সেমিডিপ বসিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে একটি সেমিডিপ চালান মৎস্য খামারের নামে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে। দুটি বিদ্যুতের সংযোগ আছে সেচের নামেই। বাকি দুটি অন্য ব্যক্তির সেমিডিপ থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চালান তিনি। অগভীর নলকূপ বসানোর জন্য উপজেলা সেচ কমিটির কোনো অনুমোদন নেননি কছির উদ্দিন।
পানি ব্যবসায় ভালো লাভ হওয়ায় প্রায় এক বছর আগে শিশু সাজিদদের বাড়ির পাশে নিজের জমিতে আরেকটি সেমিডিপ বসানোর চেষ্টা করেছিলেন কছির উদ্দিন। এ জন্য পরপর তিনটি স্থানে তিনি মিস্ত্রিদের দিয়ে বোরহোল করান। কিন্তু ৯০ ফুটের পর সেখানে পানি পাওয়া যায়নি বরং বোরহোলের পাইপ দিয়ে পাথর উঠে আসছিল। তাই এখানে আর সেমিডিপ বসানো হয়নি। তারপর সামান্য খড়কুটা ও মাটি দিয়ে বোরহোলের মুখ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। বৃষ্টিপাতে এলাকাটি তলিয়ে গেলে বোরহোলের মুখের মাটি ও খড় পানির সঙ্গে নিচে নেমে যায়। আর বোরহোলের মুখ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। গত বুধবার এই সরু গর্তে পা দিতেই নিচে ঢুকে যায় শিশু সাজিদ।
নিহত সাজিদের মা রুনা খাতুন বলেন, কছির উদ্দিন তিন জায়গা বোরিং করে ফেলে রেখেছিল। তার কারণে আমার সাজিদ মারা গেল। আমি কছির উদ্দিনের শাস্তি চাই। কছিরের শাস্তি দাবি করেছেন নিহত সাজিদের বাবা রাকিবুল ইসলামও।
তিনি বলেন, শুধু তার অবহেলার জন্য আমার একটা কলিজা আমি হারিয়ে ফেললাম। প্রশাসন সবই দেখেছে। আমি তাদের কাছে একটা সুষ্ঠু বিচার চাই।
শিশু সাজিদের বাড়ি গিয়েছিলেন তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান। তিনি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা, কিছু শুকনো খাবার ও কম্বল দেন।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, শিশু সাজিদের পরিবার অভিযোগ করলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। অভিযোগ না করলেও আইনি যেটুকু করণীয় আছে, তা আমরা শুরু করেছি।
কছির উদ্দিনের ভাই আব্দুল করিম জামায়াতে ইসলামীর পাঁচন্দর ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি টিম সদস্য। কছির উদ্দিন বাড়িতে না থাকার কারণে তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর তানোর উপজেলা শাখার আমির মাওলানা আলমগীর হোসেন বলেন, কছির উদ্দিনের ভাই আব্দুল করিম আমাদের ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। সেই সূত্রে কছিরকে কেউ জামায়াতের কর্মী বলতে পারেন। আসলে জামায়াতে তার কোনো পদ-পদবি নেই।
তানোরের উন্নয়নকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি একটি দামি ব্যবসা। এখান থেকে ভালো মুনাফা হয়। অন্তত ৭৫ শতাংশ লাভ থাকে। তাই অবৈধভাবে সেমিডিপ বসানোর প্রতিযোগিতা চলছে। বিভিন্ন আলোচনায় বিএমডিএ দাবি করে, তাদের যত গভীর নলকূপ রয়েছে তারও বেশি আছে অগভীর নলকূপ।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমনিতে মাটির নিচে পানি নেই। তাই মাঝেমধ্যে আমরা দেখি, দুই বছর পর এক স্থান থেকে সেমিডিপ সরিয়ে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। এটাকে রিবোরিং বলা হয়। খুঁজলে দেখা যাবে, তিন ভাগের এক ভাগ সেমিডিপ এভাবে স্থান বদল করেছে। স্থান পরিবর্তনের পর পাইপের গর্তটিও অনেক স্থানে থেকে গেছে। আবার নতুন সেমিডিপ বসানোর সময় নিচে পানির লেয়ার পাওয়া যায় না। তখন এক স্থান বোরহোলের পর আবার অন্য স্থানে বোরহোল করতে হয়।
এভাবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে বহু গর্ত আছে। এমন একটি গর্তেই ছোট বাচ্চাটা পড়ে যায় বলে জানান তিনি।
বরেন্দ্র অঞ্চলে মূলত কৃষকদের সেচ দেওয়ার কাজটি করে থাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। কৃষিজমিতে সেচের জন্য এই অঞ্চলে তাদের কয়েক হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আরও কয়েক হাজার সেমিডিপ বসে গেছে ব্যক্তিমালিকানায়।
বিদ্যমান সেচ আইন অনুযায়ী বিএমডিএর জায়গায় ব্যক্তিমালিকানায় গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও ব্যক্তিমালিকানার সেমিডিপের অনুমোদন দেওয়া হয় সেখানে।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে উপজেলা সেচ কমিটিকে ম্যানেজ করে এসব অনুমোদন দেওয়া হয়। সবশেষ গত বছর তানোরে ৩২টি সেমিডিপ বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে জানা গেছে, তানোর উপজেলায় সেচযন্ত্র আছে ২ হাজার ১৯৫টি। এগুলোর মধ্যে বিএমডিএর গভীর নলকূপ ৫২৯টি। ব্যক্তিমালিকানায় গভীর নলকূপ আছে ১৬টি, বাকিগুলো অগভীর। এর বাইরে প্রায় আড়াই হাজার অনুমোদনহীন সেমিডিপ রয়েছে।
শুধু তানোর নয়, গোটা রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদন ছাড়াও শত শত সেমিডিপ চলছে। এসব সেমিডিপ থেকে ৩০ থেকে ৪০ বিঘা পর্যন্ত জমিতে সেচ দেওয়া যায়। কোথাও মুরগির খামার, কোথাও আবাসিক কিংবা ক্ষুদ্রশিল্পের নামে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে নলকূপ বসিয়ে সেচপাম্প চালাচ্ছেন অনেকে।
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানি কমছেই। কোথাও কোথাও মাটির ২০০ ফুট গভীরে পানির স্তর পাওয়া যায় না। তাই এই তিন জেলার ৪ হাজার ৯১১ মৌজায় এখন খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। গত ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়।
তবে পানিসংকট নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এই সংকটের মধ্যেও অবৈধভাবে নতুন নতুন সেমিডিপ ব্যক্তিমালিকানায়।
এফআর