সরকারের ঘাড়ে দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে সরকারের ঋণ প্রায় সাড়ে ২১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ (ব্যাংক খাত এবং নন ব্যাংক খাত) প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঋণের অঙ্ক ছিল ১৮ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা।
এদিকে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ২০২৪ সাল শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলার। পাঁচ বছরে আগে অর্থাৎ ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার।
এভাবে দেশি-বিদেশি ঋণ বৃদ্ধিতে সরকারের ওপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি অর্থনীতিতেও দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, সরকারের ঋণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্পে নেওয়া বিপুল ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে, ফলে অর্থনীতিতে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।
এ অবস্থায় নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়ায় দুশ্চিন্তা আরও তীব্র হচ্ছে। তিনি বলেন, জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণ কম হলেও রাজস্ব আয়, রফতানি ও রেমিট্যান্স না বাড়লে এবং ডলারের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে না পারলে ঝুঁকি বাড়বে। এসব খাতে আয় বৃদ্ধি ও বিদেশি ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী কয়েক বছর ধরে ঋণের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই এখনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা এবং ঋণের বোঝা আর না বাড়তে দেওয়ার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
লাফিয়ে বাড়ছে ঋণ : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ বেড়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ঋণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঋণের অঙ্ক ছিল ১৮ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২০ সালে ছিল ২৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ যে ঋণ নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে আসছে পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ অন্য খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা যে ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে, সেটি জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বিদেশি ঋণ বৃদ্ধির হার বেশি : এদিকে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ আর দ্রুত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণের চাপ বাড়ছে। সরকার বিদেশি ঋণ নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দরের টার্মিনাল, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বড় বড় প্রকল্প করেছে। সেগুলোর কয়েকটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। শিগগিরই আরও কয়েকটির শুরু হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অতীতে নেওয়া সরকারি-বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পরিমাণ গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০ সালে এ ধরনের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে সুদ ও আসল হিসেবে ৩৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকা। তবে গত পাঁচ বছরে ঋণ ছাড় খুব একটা বাড়েনি। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৪ সালে সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণ ছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১১০ কোটি ডলার। পাঁচ বছর আগে তা ছিল ১ হাজার ২২ কোটি ডলার।
ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপ : ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের পরিমাণও বেড়ে গেছে। গত অর্থবছরে সরকার সুদ হিসেবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এক বছরের ব্যবধানে এ পরিমাণ বেড়েছে ১৭ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণের সুদের অর্থ পরিশোধ ২১ শতাংশ বেড়েছে, আর দেশীয় ঋণের সুদ বেড়েছে ১৬ শতাংশ।
২০১৬ সালে সুদের অর্থ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা; ২০২১ সালে এটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের সুদের অর্থ পরিশোধের পরিমাণ গত বছরে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে তার আগের বছরের তুলনায়। সেই ধারাবাহিকতায় শুধু সুদ পরিশোধের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ব্যয় ধরা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়া থেকে নেওয়া ঋণ এবং মেগা প্রকল্পের বৃহৎ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত থাকায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়বে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলেও আগামী ২০৩৪ সালের পর ঋণ পরিশোধের পরিমাণ কমে আসবে।
সময়ের আলো/এআর