মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধুরা

ফিচার

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু সশস্ত্র বা সামরিক যুদ্ধই ছিল না; মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সর্বোপরি নৈতিক সমর্থন খুবই

2025-12-16T14:38:39+00:00
2025-12-16T14:38:39+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
ফিচার
মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধুরা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:৩৮ পিএম 
মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু সশস্ত্র বা সামরিক যুদ্ধই ছিল না; মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সর্বোপরি নৈতিক সমর্থন খুবই প্রয়োজন ছিল। মুষ্টিমেয় কিছু এদেশীয় পাক দোসর ছাড়া বাংলা মায়ের সন্তানেরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদান ছিল অসামান্য।

যেখানে বিদেশি বন্ধুরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াও গণহত্যার খবর বিদেশে জানিয়ে, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, সামরিক ও আর্থিক সহায়তাসহ অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন; যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশি বন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তাদের কথা তুলে ধরা হলো :

ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড বাটা কোম্পানিতে চাকরি করতে এসেছিলেন এ দেশে। ১৯৭১ সাল। টঙ্গীতে ছিল তার কার্যালয়। পাকিস্তানিদের সেনাদের গণহত্যা ওডারল্যান্ডকে বিচলিত করে তোলে। সেসময় ৫৪ বছর বয়সী ওডারল্যান্ড মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বিদেশি বলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখত না। ওডারল্যান্ড সেসব তথ্য নিয়মিত পাঠাতে থাকেন ২ নম্বর সেক্টরের মেজর এ টি এম হায়দারের কাছে। যোগাযোগ রাখতেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গেও।

২ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনে থাকা একের পর এক ব্রিজ আর কালভার্ট উড়িয়ে দিয়ে ওডারল্যান্ড পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রগতি রুখে দিতে থাকেন। তাঁর পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার আশেপাশে পাক সেনাদের ক্যাম্পগুলোতে গেরিলা হামলা চালাতে থাকে। ঢাকার অস্ট্রেলিয় হাইকমিশন এই সময়ে ওডারল্যান্ডকে গোপনে অনেক সাহায্য করেছিল।

ওডারল্যান্ড মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা সামগ্রী, গরমকাপড় ও অস্ত্রশস্ত্র আনিয়েছিলেন বাংলাদেশে। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরত যান বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড ‘বীর প্রতীক’। ওই বছরই তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেওয়া হয়। একমাত্র বিদেশি যিনি এ স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

২০০১ সালের ১৮ মে পার্থের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান।

জর্জ হ্যারিসন

 মানবতাবাদী ব্রিটিশ ব্যান্ড গায়ক জর্জ হ্যারিসন তার দল ‘বিটল্সকে’ নিয়ে নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১ আগস্ট আয়োজন করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বাঙালির চিরজনমের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী পণ্ডিত রবিশংকরের প্রেরণায় দুই গুরু-শিষ্য মিলে এর আয়োজন করে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়ে নিজেরাই ইতিহাসের অংশ হয়ে স্থান করে নেন আমাদের হূদয়ে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাম শুনেছিল সেদিন। জেনেছিল সেদিনের চলমান মুক্তযুদ্ধের কথা, জানতে পেরেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার কথা।

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর বড় আকর্ষণ ছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান। জর্জ হ্যারিসন আটটি গান গেয়েছিলেন। বব ডিলান গেয়েছিলেন পাঁচটি গান। রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেছিলেন। লিওন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রেস্টনের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন তার সেই অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। গানটি জর্জ হ্যারিসনের নিজের লেখা এবং সুর করা। গানের মূল কথাই ছিল বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। 

সাইমন ড্রিং

সাইমন ড্রিং একমাত্র সাংবাদিক, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের ভয়াবহতা ও নৃশংসতার শুরু থেকেই প্রতিবেদন করেছিলেন। বাংলাদেশে তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সায়মন ড্রিং ৬ মার্চ কম্বোডিয়া থেকে ঢাকায় আসেন। তখন তিনি দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি উঠেছিলেন ঢাকার শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করার আগেই ঢাকায় সে সময় অবস্থানরত সব বিদেশি সাংবাদিককে ওই হোটেলে অবরুদ্ধ করে ফেলে। সেনা কর্তৃপক্ষ তাদের বলে, শহরের পরিস্থিতি খুব খারাপ, নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের হোটেলের ভেতরেই অবস্থান করতে হবে। পরদিন সকালেই তাদের বিমানবন্দরে নিয়ে তুলে দেয়া হয় উড়োজাহাজে। কিন্তু পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সাইমন ড্রিংকে খুঁজে পায়নি। 

তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হোটেলেই লুকিয়ে ছিলেন। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ উঠে গেলে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। এরপর ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন লেখেন। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৩০ মার্চ সেটা ছাপা হয়। যাতে গণহত্যার বিস্তারিত ওঠে আসে। এই প্রতিবেদন থেকেই বিশ্ববাসী জানতে পারে পাকিস্তানি বাহিনীর সেদিনের বর্বরতার কথা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের প্রাথমিক মুহূর্ত ছিল সেটি।

৩০ মার্চ সাইমন ড্রিংকে লন্ডন চলে যেতে হয়। এরপর কলকাতায় আসেন নভেম্বরে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিতেন লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তিনি মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ট্যাংকে চড়ে ময়মনসিংহ হয়ে মুক্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করেন।
সাইমন ড্রিংয়ের জন্ম ইংল্যান্ডে ১৯৪৫ সালে। তিনি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন ১৮ বছর বয়স থেকে। দেখেছেন ২২টি যুদ্ধ, অভ্যূত্থান ও বিপ্লব। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন নানা দেশের অসংখ্য সহমর্মী মানুষ। যুদ্ধের মাঠে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, শরণার্থীশিবিরে, প্রতিবাদে বা জনমত গঠনে কঠিন সেই সময়ে তারা ভূমিকা রেখেছেন। তাদের একজন সাইমন ড্রিং।

ইন্দিরা গান্ধী

ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাণের বন্ধু। বাংলাদেশে যখন নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা তখন অসংখ্য বাঙালি প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের ওপারে গিয়ে পেয়েছিলেন জীবনের নিরাপত্তা। ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে মানবিক বিপর্যয় দেখতে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রায় এক কোটি লোক জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতের বিভিন্ন এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে ওঠেন তিনি। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে খাদ্য ও বাসস্থান দিয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা করেন।

অ্যালেন গিন্সবার্গ

কবি এবং কাব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলোড়ন তুলেছিল। সেই কবির নাম অ্যালেন গিন্সবার্গ। তিনি একজন মার্কিন কবি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তিনি লিখেছিলেন একটি দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটির নাম ছিল- ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। তার কবিতাটি ছুঁয়ে যায় হাজারো মানুষের হৃদয়। নিপীড়িত মানুষের হাহাকার মেশানো, যুদ্ধের বাস্তব চিত্র কবিতার অক্ষরে অক্ষরে জানান দিয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য। তার কবিতা শুনে ও পড়ে অশ্র“সজল হয়ে পড়ে হাজারো মানুষ। বাংলাদেশের পক্ষে একাত্ম হয়ে ওঠেন বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত সাহিত্যপ্রেমিক।

মার্কিন সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি

বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। তাদেরই একজন মহান ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশিদের অকৃত্রিম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। এডওয়ার্ড কেনেডি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। পাকিস্তান বাহিনীর পাশবিকতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক কোটি শরণার্থীর দুর্দশা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে কেনেডি সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট করেছিলেন ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’। 

/এমএইচআর


  বিষয়:   মুক্তিযুদ্ধ  বিদেশি  বন্ধু  ১৬ ডিসেম্বর 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: