সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালে (এসজিএইচ) চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন ও অপরিবর্তিত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিঙ্গাপুরে হাদির চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জন ও হাদির চিকিৎসায় যুক্ত থাকা ডা. আব্দুল আহাদ। অন্যদিকে হাদিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবিরকে ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিবুজ্জামান।
ডা. আব্দুল আহাদ জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঢাকায় অস্ত্রোপচার ও নিবিড় চিকিৎসা শেষে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি কমপ্লেক্সে ভর্তির পর থেকেই নিউরোসার্জারি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার টিম যৌথভাবে তার চিকিৎসা শুরু করে। নেওয়ার পর করা ব্রেনের সিটি স্ক্যানে হাদির বাঁ-পাশের ইস্কেমিক অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি ব্রেনে ফোলা বা ইডেমা এখনও বিদ্যমান। ব্রেন স্টেমে আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকুলার সিস্টেমেও চাপ তৈরি হয়েছে; যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডা. আব্দুল আহাদ জানান, বর্তমানে হাদির কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস সচল আছে। তবে নিউরোলজিক্যাল রেসপন্সে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি বা অবনতি কোনোটিই লক্ষ করা যাচ্ছে না।
ডা. আহাদ আরও জানান, হাদির ফুসফুসের সর্বশেষ সিটি স্ক্যানে আগের মতোই রক্তের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ কারণেই বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তার বুকে চেস্ট ড্রেন দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরেও সেই জটিলতা মাথায় রেখেই শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থাপনা চলমান রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। ব্রেন ইনজুরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা বা ‘টাইম উইন্ডো’ থাকে, যার মধ্যে যদি শরীর ইতিবাচক সাড়া দেয়, তা হলে পরবর্তী অবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সময়সীমার মধ্যেই হাদির শরীর কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না, সেদিকেই এখন চিকিৎসকদের নজর।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবিকে নাকচ করেছেন চিকিৎসকরা। ডা. আহাদ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হাদি চোখ খুলেছেন বা অবস্থার উন্নতি হয়েছে-এ ধরনের কোনো তথ্য সত্য নয়। তার অবস্থা এখনও স্ট্যাটিক, অর্থাৎ আগের জায়গাতেই রয়েছে। জ্ঞান ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে চিকিৎসকরা এখনই কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস দিতে পারছেন না। তবে চিকিৎসকরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক সময় অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। সে আশাতেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের পাশাপাশি হাদির পরিবার ও সহকর্মীরাও দেশবাসীর কাছে দোয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গুজব বা অনুমানভিত্তিক তথ্য না ছড়িয়ে দায়িত্বশীল থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।
এর আগে সোমবার রাতে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসকদের বরাতে হাদির শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার বড় ভাই ওমর ফারুক জানান, হাদির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হার্টবিট এখন স্বাভাবিক রয়েছে। আগের তুলনায় তার হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে হাদির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ওমর ফারুক জানান, চিকিৎসকরা তাকে স্যালাইনের মাধ্যমে বেশ কিছু ওষুধ পুশ করেন এবং তাকে দুই ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখেন। এরপর হাদি চিকিৎসায় সাড়া দেওয়া শুরু করেন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ও হার্টবিট স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং তার হৃদপিণ্ড আগের চেয়ে বেশি কাজ করা শুরু করে।
তিনি আরও জানান, ওসমান হাদির স্বাস্থ্যের অবস্থা স্থিতিশীল হলে তার জন্য অতি প্রয়োজনীয় সব স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা সোমবার রাতেই (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা পর্যন্ত) সম্পন্ন করা হয়। তাকে বিশেষায়িত আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
গত শুক্রবার ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। পেছন থেকে অনুসরণ করে আসা একটি মোটরসাইকেল থেকে এক ব্যক্তি ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করে। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে দ্রুত হাদিকে ঢাকা মেডিকেলে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ফয়সালের সহযোগী কবির ৭ দিনের রিমান্ডে : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবিরকে ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিবুজ্জামান।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান জানান, কবিরকে ১০ দিনের রিমান্ডে পেতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের মতিঝিল জোনাল টিমের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ। শুনানি নিয়ে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে কবিরকে গ্রেফতার করে র্যাব। সেদিনই ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু ও বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে ৫ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।
এর আগে গত রোববার হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল মালিক আব্দুল হান্নানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পরিবারের সম্মতি নিয়ে রোববার রাতে পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করে চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলিটি লাগে হাদির মাথায়।
সময়ের আলো/এনএ