বিদায় নিল ঘটনাবহুল বছর, ২০২৫ সাল। আজ ১ জানুয়ারি, ২০২৬ সাল। খ্রিস্টীয় নতুন বছরের প্রথম দিন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এবার শোকের আবহে নতুন বছরে পদার্পণ করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। তবে অন্য যেকোনো বছরের মতো এবারও নতুন বছরের প্রথম দিনটি নতুন উদ্দীপনার মাধ্যমে বরণ করছে দেশের মানুষ।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের শেষ দিনটি অর্থাৎ বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সারা দেশের মানুষ একেবারে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন। গতকাল খালেদা জিয়ার জানাজাকে ঘিরে পুরো ঢাকা শহর লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ একেবারে শোকে মুহ্যমান। স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা শেষে বিএনপি চেয়ারপারসনকে শেরেবাংলা নগরস্থ তার স্বামী শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের মানুষের সব আনন্দ যেন বিলীন হয়ে গেছে। এই শোকের সময় নতুন বছরের আনন্দ-উদযাপন থেকে দেশের মানুষ বিরত থাকছে এবার। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন সাধারণ ছুটি ও রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি থার্টিফার্স্ট নাইটেও আতশবাজি, পটকাবাজি বা এ ধরনের অন্য কোনো আয়োজন করতে বারণ করা হয়েছে। এ জন্য বছরের শেষ দিনটিতে গতকাল তেমন কোনো আয়োজনও ছিল না। অন্যবার পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে অনেক স্থানে রাতভর অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, এবার হোটেলগুলোতেও সেরকম কোনো ঝাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছিল না। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই চলে শোকের আবহ।
তবে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিদায়ি বছরের ব্যর্থতা-গ্লানি পেছনে ফেলে আজ থেকে শুরু হওয়া নতুন বছরটি যেন সবদিক থেকে মঙ্গলময় হয়। ২০২৫ সালের পুরো বছর দেশে চরম অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপড়েন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেশের মানুষকে অনেক ভুগিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসহ দেশের আরও কয়েকটি স্থানে বড় অগ্নিকাণ্ড, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয় ধরানো ভূমিকম্পসহ আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বিদায় বছরটিতে। এসব ঘটনা দেশের মানুষের মনে দীর্ঘদিন রেখাপাত করবে।
অবশ্য বিদায়ি বছরের শেষ কয়েকটি মাস জুলাই সনদ, গণভোট- সর্বোপরি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েই দেশের মানুষকে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এই ইস্যুগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন টানাপড়েন দেখা গেছে চরমভাবে, তেমনই আন্দোলনের নামে রাস্তাঘাট আটকে রাখায় জনগণকে ভোগান্তি পোহাতেও হয়েছে ব্যাপক।
আর বছরের একেবারে শেষভাগে এসে জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করলে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো জাতি। এরপর দেশের মানুষের সব নজর কেড়ে নেয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে আসার ঘটনা। গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে দোলাচল ছিল তার অনেকটাই কেটে যায়- রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। তবে তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঠিক ৫ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর দীর্ঘদিন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করলে পুরো জাতি আবারও শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। এই শোক নিয়ে আজ নতুন বছরে পদার্পণ করছে দেশের মানুষ।
তবে আজ থেকে শুরু হওয়া ২০২৬ সালে ভালো কিছুর প্রত্যাশাই করছেন দেশের মানুষ। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি যেন অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর হয় সে প্রত্যাশা করছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেন আবারও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ভালোভাবে শামিল হতে পারে এবং একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আসে সে প্রত্যাশাও রয়েছে দেশের মানুষের।
সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক দেশ গড়ার প্রত্যাশা প্রধান উপদেষ্টার : ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে ও বিদেশে বসবাসরত সব বাংলাদেশিসহ সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বুধবার দেওয়া এক বাণীতে আজ বৃহস্পতিবার ‘ইংরেজি নববর্ষ’ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা এ শুভেচ্ছা জানান।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘নতুন বছরে আরও জোরদার হোক সম্প্রীতি, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। সবাইকে শুভ নববর্ষ।’
তিনি বলেন, ‘নববর্ষ মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা ও নতুন সম্ভাবনার সূচনা। নতুনের এ আগমনি বার্তা আমাদের উদ্বেলিত করে। সব গ্লানি ভুলে সুন্দর আগামীর পথচলার জন্য জোগায় নবোদ্যম ও অনুপ্রেরণা।’
একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা সবাই দেশকে ভালোবেসে মানুষের কল্যাণে সর্বশক্তি নিয়োগ করব- এমন আশা প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুন বছরে সব চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করে একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন বছর আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেরামত করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যে যাত্রা আমরা শুরু করেছি, নতুন বছরে একটি জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পাবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি বলেন, সব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে এ নির্বাচন ও গণভোট আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবেÑ নতুন বছরে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনে একযোগে কাজ করতে হবে : তারেক রহমান
নতুন বছরে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাসহ সার্বিকভাবে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বুধবার দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে আমি কামনা করি দেশ-বিদেশের সবার অনাবিল আনন্দ, শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। শুভ নববর্ষ। তিনি বলেন, নববর্ষ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও চেতনার প্রতিচ্ছবি। নতুন বছরে আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখি একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে। আমরা এমন একটি জাতি নির্মাণের প্রত্যাশা করছি, যেখানে প্রতিটি নাগরিকই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রত্যেকের কণ্ঠ স্বাধীন থাকবে।
বাণীতে তারেক রহমান তিনি বলেন, গত বছরটি এখনও আমাদের মনে জাগ্রত। অর্জন, সাফল্যের পাশাপাশি বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ও প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা একদিকে যেমন আমাদের উচ্ছ্বসিত করবে, অন্যদিকে আবার বেদনার্ত করবে। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হবে- একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাসহ সার্বিকভাবে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনে একযোগে কাজ করা। গণবিরোধী পরাজিত শক্তি এতদিন জনগণের সব অধিকারকে বন্দি করে রেখেছিল। এখন আবারও সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করতে হবে।
অন্য এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নববর্ষে মানুষ পুরোনো ভুল পরিহার করে নতুন সংকল্প নেয়, সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য। এটি অতীতকে বিদায় জানিয়ে নতুন করে শুরু করার এবং আশা ও উদ্দীপনার সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে নতুন আশা, আনন্দ এবং ঐক্যের বার্তা নিয়ে আসে। অতীতের সফলতা ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতায় নতুন করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে শুরু করে। আমাদের প্রত্যয় একটি আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণ করা, যেখানে মানুষের বাক-ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। ব্যক্তিস্বাধীনতার গ্যারান্টি থাকবে, মানবিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্রসমাজ নির্মাণই হবে আমাদের নববর্ষের অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এখনও হয়তো আরও কষ্টকর পথ অতিক্রম করতে হবে, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য। রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্রের চর্চা এবং বিকাশ সাধনে আমাদের আরও বেশি তৎপর হতে হবে। আর কোনোভাবেই যাতে নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয় সে জন্য আমাদের মজবুত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। আমাদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। নতুন বছরে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নতুন বছরটি হয়ে উঠুক আনন্দময়, আমি এই কামনা করি।
সময়ের আলো/কেএইচও