অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও প্রার্থীদের ছোটখাটো আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে আজ শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। এবারের প্রচারে দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। ফলে শেষ দিন পর্যন্ত প্রচারের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই নির্বিঘ্নে ভোটারদের কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ অত্যন্ত ভালো রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখেছি, প্রার্থীদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই। তফসিলের পর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ও শেরপুর-৩ আসনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে একজন জামায়াত নেতা নিহত হওয়া ছাড়া এ পর্যন্ত তেমন কোনো বড় সহিংসতা ঘটেনি। আশা করি, ভোটের দিনের পরিবেশ এর চেয়েও ভালো থাকবে। কারণ নির্বাচনে এক লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়ন করা হয়েছে। আগের কোনো নির্বাচনে এতসংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়ন করা হয়নি।
এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ সব বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো দেশ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। যাতে হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিয়ে ভালোভাবে বাড়ি ফিরতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাজেই ভোটের পরিবেশ ভালো ছিল ভালো থাকবে বলে আশা করছি। ভোট নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ভোট নিয়ে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না। তবে ভোটাররা যাতে ভোট দিতে আসে এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ভোটের পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে সব জায়গায় ব্যালট পেপার পৌঁছে গেছে। একদম উপজেলা পর্যন্ত সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রে কেন্দ্রে এগুলো পৌঁছানো হবে।
ইসি সূত্রে যানা যায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ৩২৭টি নির্বাচনি এলাকায় ৩৫৩টি আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিট্রেটরা ২২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা জরিমানা করেন এবং ২১২টি মামলা করা হয়।
অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৩ থেকে ১৫০টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম দফার নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর (২২-৩০ জানুয়ারি) মাত্র এক সপ্তাহেই সংঘর্ষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫টিতে। বেশিরভাগ ঘটনায় দলীয় সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তেজনা ও বিরোধ থেকেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের ধরন ছিল দলীয় হামলা, পাল্টা-পাল্টিধাওয়া, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং ভাঙচুর।
গত ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার। তফসিল অনুযায়ী প্রচার শেষ হওয়ার সময় ছিল ১০ জানুয়ারি (আজ) সকাল সাড়ে ৭টা। ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার বন্ধ রাখার আইনগত বিধান অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের সভা, মিছিল, প্রচারপত্র বিতরণ বা গণমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে সব ধরনের নির্বাচনি প্রচার বন্ধ। বড় আকারের মিছিল, সভা ও শোডাউন বন্ধ থাকবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার বন্ধ রাখতে মনিটরিং করা হবে। এ জন্য কমিশনের একটি আলাদা সেল কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, এখন পর্যন্ত মারাত্মক কোনো পরিস্থিতির খবর নেই। তবে তফসিল ঘোষণার পর দুটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা নিন্দনীয়। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রয়েছে এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বড় কোনো ঘটনা এখনও পাওয়া যায়নি। ইসি সচিব বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কার কারণ নেই। সবাই মিলে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম সময়ের অলোকে বলেন, এবার ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত অনেক ভালো। এটি ভোটের দিন পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। তবে এবার অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে এবং আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে।
সংসদ নির্বাচনে এবার ভোট হবে ২৯৯টি আসনে। তিনশ আসনে তফসিল ঘোষণা করা হলেও শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২৯৯ আসনে। ইসির তথ্য অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৩৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৭৫ প্রার্থী। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে দলটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন প্রার্থী। ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ জন প্রার্থী। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ জন প্রার্থী।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে, যেখানে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বাধিক ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে, যেখানে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হবে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, যা চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।