ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে রাজধানীতে বসবাসরত লাখো ভোটার নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন। এর ফলে গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশনসহ সদরঘাটে তৈরি হয়েছে উপচেপড়া ভিড়। নির্বাচন ঘিরে এই যাত্রা অনেকের কাছেই যেন ঈদে বাড়ি ফেরার মতো আনন্দের। মঙ্গলবার রেলস্টেশন, বাসটার্মিনাল ও লঞ্চঘাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বুধ ও বৃহস্পতিবার সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর শুক্র ও শনিবার রয়েছে সরকারি ছুটি। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে লম্বা ছুটি পাচ্ছেন চাকরিজীবীরা। এতে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি নিজ এলাকায় গিয়ে কয়েক দিন ঘুরে আসারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ হাতছাড়া করছেন না তারা। নাগরিক দায়িত্ব পালন ও পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে রাজধানী ছাড়ছেন অনেকেই।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনগুলোয় এলাকামুখী যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বচ্ছ ও হানাহানিমুক্ত নির্বাচনের প্রত্যাশা এবং বাড়তি উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ফিরছেন তারা।
মঙ্গলবার ভোর থেকেই কমলাপুর রেলস্টেশনে বাড়তে থাকে যাত্রীদের চাপ। সূর্য ওঠার আগেই প্ল্যাটফর্মে জড়ো হন শত শত মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের আনাগোনাও বাড়তে থাকে। কারও হাতে বড় ট্রলি ব্যাগ, কারও কাঁধে ব্যাকপ্যাক, কেউ আবার শিশুদের হাত ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রেনের ঘোষণা ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। কেউ সিট খুঁজছেন, কেউ স্বজনদের ডাকছেন, কেউ শেষ মুহূর্তে ফোনে বাড়ির খবর নিচ্ছেন। মুহূর্তেই স্টেশন এলাকা হয়ে ওঠে সরব ও প্রাণচঞ্চল।
স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অনেকে একা একা বাড়ি যাচ্ছেন। আবার অনেকে দলবেঁধে ফিরছেন। স্ত্রী, ছেলে-মেয়েও সঙ্গে আছে অনেকের। প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশে বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠেছেন কেউ কেউ। আবার কেউ চুপচাপ ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। তবে সবার চোখেমুখেই একই ধরনের উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের উৎসবের আবহ। তবে সিট না পেয়ে অনেককেই ট্রেনের ছাদে করে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রামীম হোসেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিনি বলেন, ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি। টানা ছুটি আছে। স্টেশনে একেবারে ঈদের আমেজ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। মোবারক আলী নামে এক সবজি ব্যবসায়ী বলেন, টিকেট কিনেছি কিন্তু সিট পাইনি। যাত্রীর যেই চাপ, ছাদে করেও যেতে হতে পারে।
রেলপথের মতো সড়কপথেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে সকাল থেকেই বাড়তি যাত্রীচাপ লক্ষ করা গেছে। দূরপাল্লার বাসের কাউন্টারে টিকেট সংগ্রহে লম্বা লাইন দেখা যায়। অনেকে আগেভাগে টিকেট কেটে রাখলেও শেষ মুহূর্তে টিকেট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া বেশি দামে টিকেট বিক্রির অভিযোগও করেছেন যাত্রীরা। বাস না পেয়ে অনেক যাত্রীকে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরতেও দেখা গেছে।
গাবতলী বাস টার্মিনালে কথা হয় সিরাজগঞ্জগামী যাত্রী রকিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, এমনিতে বছরে দুই-তিনবার বাড়ি যাই। তবে এবার তো ভোট দিতে হবে। ভোটটা নিজের এলাকায় গিয়ে দিতে চাই।
রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালেও অন্যদিনের তুলনায় যাত্রীদের চাপ ছিল বেশি। অনেককেই পরিবারসহ গ্রামে ফিরতে দেখা গেছে। টার্মিনালে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন খন্দকারের বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার জন্যই বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু বাসের ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে। তারপরও যেতে হবে। কিছু করার নেই।
দুপুর দেড়টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বাসের অপেক্ষায় থাকা এসএম সোহেল বলেন, কারখানা বন্ধ। সে কারণে ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি। নির্বাচনের আগে শিল্পকারখানা বন্ধ রেখে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ায় এ সময় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী নিয়ে একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা যায়। ইমরান হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, ভোট দিতে দেশে যাচ্ছি। বহু বছর পর ভয়হীন নির্বাচন হচ্ছে। আবার কবে হয়, কে জানে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নির্বাচন শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয় বরং দেশ গড়ার বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন তরুণ ও নতুন ভোটাররা। সে কারণেই এই সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না তারা।
আসিফ মজুমদার নামে এক তরুণ বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভোট নষ্ট করা ঠিক হবে না বলে আমি মনে করি। আমার বন্ধুরাও বাড়ি যাচ্ছে। আশা করি, একটি ভালো নির্বাচন হবে। উম্মে আয়েশা নামে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, ভোটার হয়েও গত নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। কিন্তু এবার পরিবেশ ভালো মনে হচ্ছে। তাই ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি।
সময়ের আলো/কেএইচও