ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রচারের শেষ মুহূর্তে সবার মুখে এখন ফলাফল নিয়ে বিস্তর আলোচনা। দেশের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম দৈনিক সময়ের আলো পরিচালিত আসনভিত্তিক জরিপে এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে। দেশের ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ১৭০ এবং জামায়াত জোট ৭০ আসনে এগিয়ে রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন ২০টিতে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে ৩৪টি আসনে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩ ও ইসলামী আন্দোলন এগিয়ে রয়েছে ২টি আসনে। ভোট স্থগিত রয়েছে ১টি আসনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ৩০০ সংসদীয় আসন থেকে সশরীরে মোট ১ হাজার ৫০০ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে। প্রতি আসনে ৫০ জন ভোটার থেকে মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপ কার্যক্রম চলে ১৫ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। পরবর্তীতে শেরপুর-৩ আসনটি স্থগিত করা হয়।
জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি মোট আসনের প্রায় ৫৬ শতাংশে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রভাব ধরে রেখেছে মোট আসনের ২৩ শতাংশে। ২০টি আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যা মোট আসনের ৬.৭ শতাংশ। কিন্তু পুরো নির্বাচনের আগ্রহে রয়েছে ৩৪টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, যা মোট আসনের ১১ শতাংশ। শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল মারা যাওয়ায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
শীর্ষ চার নেতা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রধানরা পৃথক ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জরিপের ফল অনুযায়ী বিএনপি, জামায়াতের প্রধানরা নিজ নিজ আসনে এগিয়ে আছেন। এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রধান তার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
জরিপের ফল অনুযায়ী ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এগিয়ে আছেন। আর ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের ঢাকা-১৩ আসনেও বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
সময়ের আলোর জরিপের উদ্দেশ্য হলো নিরপেক্ষ, প্রতিনিধিত্বমূলক ও তথ্যভিত্তিক মতামত সংগ্রহ করা, যাতে সংসদীয় আসনভিত্তিক ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব, চাহিদা ও প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়। প্রতিটি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত উপজেলা-থানা থেকে জরিপ পরিচালনা করা হয়।
নমুনা নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভোটার নির্বাচনে যথাসম্ভব বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সামাজিক শ্রেণি বা পেশার প্রতি পক্ষপাত এড়িয়ে চলা হয়েছে। ৫০ জন ভোটারের মধ্যে প্রথমবার ভোটার; তাদের মধ্যে নারী ও পুরুষ ভোটার। নারী ভোটারের মধ্যে কর্মজীবী নারী ও গৃহিণীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। জরিপে সংখ্যালঘু ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় পেশাজীবী (ইমাম, পুরোহিত, ভিক্ষু, ধর্মীয় শিক্ষক) স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। কর্মজীবী ভোটারের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শিক্ষিত (প্রাথমিক/মাধ্যমিক/উচ্চশিক্ষিত) ও অক্ষরজ্ঞানহীন উভয়ই ছিলেন। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরাসরি মুখোমুখি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। উত্তরদাতার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। কোনো প্রশ্নে উত্তর না দিতে চাইলে তা সম্মান করা হয়েছে।
দৈনিক সময়ের আলোর জরিপ বলছে, দেশের ৩৬ শতাংশ মানুষ মনে করে যে ভোটের পর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। জরিপে তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি মনে করেন এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে।’ জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ১৪ শতাংশ মানুষ মনে করে ভোটের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। এ ছাড়া ৩২ শতাংশ মানুষ মনে করছে ভোটের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে কি না তা ‘অনিশ্চিত’। এ বিষয়ে ১৬ শতাংশ মানুষের কোনো মন্তব্য করেননি।
দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। সময়ের আলোর জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনার মতে নির্বাচনটি কি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।’ ভোট অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সময়ের আলোর জরিপে ভোট সুষ্ঠু হবে বলে মনে করেন দেশের অধিকাংশ মানুষ। এ ছাড়া ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না বলে মনে করেন ১৫ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া আংশিকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে মনে করেন ১৬ শতাংশ এবং কোনো ধারণা নেই ১৮ শতাংশ মানুষের।
সময়ের আলোর জরিপে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার কাছে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ ভোটার মনে করেন তার কাছে প্রার্থীর যোগ্যতার চেয়ে দলের আদর্শ ও ইশতেহার ৩১ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া প্রার্থীর স্থানীয় সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে কি না তা দেখে ভোট দেবেন ২৪ শতাংশ ভোটার, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেবেন ২৭ শতাংশ ভোটার এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা দেখে ভোট দেবেন ১৮ শতাংশ ভোটার।
পুরোনো সব নিয়ম ভেঙে এবার জয়-পরাজয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে তরুণ ভোটাররা। দেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা প্রভাব ফেলবে। সময়ের আলোর জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি মনে করেন তরুণ ভোটাররা এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।’
এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৪৮ শতাংশ ভোটার মনে করেন বড় ভূমিকা রাখবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৩৭ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন এবং নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৯ জন। আর হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৮৪৮ জন ছিল। গত সংসদ ভোটে মাত্র ৪১ শতাংশ ভোট পরেছিল। এবার ভোটার তালিকা হালনাগাদের পর প্রায় ১৩ কোটি ভোটার ভোট দিতে পারবেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
হালনাগাদ ভোটার তালিকার ভোটারদের বয়ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সের (তরুণ) ভোটার রয়েছেন ৩ কোটি ৫ লাখ। ৩০ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে ভোটার রয়েছে ১ কোটি ৫১ হাজার। এর পরের অবস্থানে ৩৪ থেকে ৪১ বছরের মধ্যে ভোটার ২ কোটি ৫৩ লাখ ভোটার। এ ছাড়া ৪২ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ভোটার রয়েছে ৪ কোটি। ৬০ বছরের ওপরে রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ভোটার।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মূল নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। ভোটের মাঠেও এবার তরুণ প্রার্থীর ছড়াছড়ি রয়েছে। দলগুলোর ফোকাসও থাকবে বিপুলসংখ্যক এই তরুণের দিকে। তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তরুণদের ভোট নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। তাই রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার চাবি এখন তরুণ ভোটারদের হাতে।