শেষ হলো প্রচার যুদ্ধ, থেমে গেছে কথার লড়াই। কোন দল জিতবে কে হারবে এবং কে কতটা জনপ্রিয়, কে হাসবে শেষ হাসি এই নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের চর্চা। ভোটের জরিপ ও নানা সমীকরণ চোখ ভোটার ও প্রার্থীদের। তবে সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বহুল প্রত্যাশিত ভোটের ফলাফলের ওপর। এখন অপেক্ষা শুধু উৎসবমুখর ভোটগ্রহণের।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার। তাই ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে শনিবার বিকাল পর্যন্ত সব ধরনের মিছিল, জনসভা বা শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা এবং ভোটগ্রহণ সমাপ্তির পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচনি এলাকায় কোনো জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না।
সে ক্ষেত্রে এ সময়ের মধ্যে বন্ধ থাকবে সব জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রা।আগামীকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হবে কাক্সিক্ষত ভোটগ্রহণ। চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এখন চলছে ভোটের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ভোটকে কেন্দ্র দেশের সব জেলায় পৌঁছে গেছে ভোটের সামগ্রী। মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, ইতিমধ্যে জেলা থেকে ব্যালট পেপার উপজেলায় পৌঁছে গেছে। বুধবারের মধ্যেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপার। সকাল থেকে ব্যালট দেওয়ার কাজ শুরু করব।
২৯৯ আসনে ভোট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শুরুতে ৩০০ আসনে ভোটের তফসিল ঘোষণা করা হলেও সম্প্রতি শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে এই আসনের নির্বাচন বাতিল করেছে ইসি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে ৫১টি রাজনৈতিক দল : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী করছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে এবার ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ২ হাজার ২৮ প্রার্থী। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন প্রার্থী।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ জন প্রার্থী। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ জন প্রার্থী। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে ২৭৫ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে।
৫০ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে। সব মিলিয়ে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৫৮টি। আর মোট ভোট কক্ষ রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ইন-পার্সন ভোটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পোস্টাল ভোটের বিষয়ে তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারদের কাছে ৭ লাখ ৩ হাজার ব্যালট পৌঁছেছে। বাকিগুলো ট্রানজিটে রয়েছে, যা ভোটের আগেই পৌঁছে যাবে।
মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ : এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে, যেখানে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বাধিক ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে, যেখানে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন।
ভোটের দায়িত্বে থাকছে ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য : নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকছে ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। দায়িত্ব পালন করবেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। ভোটগ্রহণের আগের দুদিন, ভোটগ্রহণের দিন ও ভোটগ্রহণের পরের দুদিন অর্থাৎ ১০ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের জন্য প্রথম শ্রেণরি হাকিম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিচারিক হাকিমরা দায়িত্ব পালনকালে কোনো নির্বাচনি অপরাধ বিচারার্থে আমলে গ্রহণ করলে যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার নিষ্পত্তি করবেন এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (আইন-১ শাখা) বরাবর নির্দিষ্ট ছকে প্রেরণ করবেন। এ ছাড়া নিরাপত্তায় এবার যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ইউএভি (ড্রোন) এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা। এ ছাড়া ৯৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, মাঠ পর্যায়ে ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং ৫ লক্ষাধিক পোলিং অফিসার ভোটগ্রহণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন। বুধবার সকাল থেকে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে।
প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর জানানো হবে ভোটের ফলাফল : সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী এবার ভোটার সিøপে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকতে পারবে। নির্বাচনের দিন প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর অগ্রগতির রিপোর্ট প্রদান করা হবে (মোট চারবার)। গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ফলাফল একই সঙ্গে ঘোষণা করা হবে। বেশিরভাগ ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে ইসি। পরের দিন সকালে রিটার্নিং অফিসার ‘ফর্ম-১৮’ তে স্বাক্ষর করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশিত হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ৩০০টি মামলা : ইসি আবুল ফজল জানান, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্ট চক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।
সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান ইসির : ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে মানুষের গ্রামে যাওয়ার ঢল দেখে ভালো ভোটার টার্নআউটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কমিশন সব রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের সুন্দর ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।
ভোটের মাঠে থাকছে ৪৫ হাজার ৩৩০ জন পর্যবেক্ষক : ইসি সানাউল্লাহ জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার বিশাল বহর মাঠে থাকছে। দেশীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, যা আরও বাড়তে পারে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যাদের মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সংবাদকর্মী।
ভোটের দিন যেসব যান চলাচল করতে পারে : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাত থেকে ২৪ ঘণ্টা সড়ক ও নৌপথে যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোটরসাইকেল বন্ধ থাকবে তিন দিন। তবে কিছু কিছু যান চলাচল নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্তও রেখেছে সংস্থাটি। ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিবসের পূর্ববর্তী মধ্যরাত অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ ও মাইক্রোবাস চলাচল বন্ধ থাকবে। সেই সঙ্গে ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক, জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন এবং ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ও সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন, আত্মীয়স্বজনের জন্য বিমানবন্দরে যাওয়া, বিমানবন্দর থেকে যাত্রী বা আত্মীয়স্বজনসহ নিজ বাসস্থানে অথবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত যানবাহন (টিকেট বা অনুরূপ প্রমাণ প্রদর্শন সাপেক্ষে) এবং দূরপাল্লার যাত্রী বহনকারী অথবা দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য যেকোনো যানবাহন।
প্রার্থীর জন্য ১টি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্টের জন্য (যথাযথ নিয়োগপত্র/পরিচয়পত্র থাকা সাপেক্ষে) ১টি গাড়ি (জিপ, কার, মাইক্রোবাস ইত্যাদি ছোট আকৃতির যানবাহন) রিটার্নিং অফিসারের অনুমোদন সাপেক্ষে চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া সাংবাদিক, পর্যক্ষেক অথবা জরুরি কোনো কাজে ব্যবহৃত যানবাহন বা মোটরসাইকেল নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং অফিসারের অনুমোদন সাপেক্ষে চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে।
আবার নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য মোটরসাইকেল চলাচল, টেলিযোগাযোগ সেবাকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনা করে বিটিআরসি এবং বিটিআরসি থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে।
এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়ক (হাইওয়েজ), বন্দর ছাড়াও আন্তঃজেলা বা মহানগর থেকে বাইরে বা প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মহাসড়ক ও প্রধান প্রধান রাস্তার সংযোগ সড়ক বা এ ধরনের সব রাস্তায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে। এদিকে নৌপথেও একই রকম নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। তবে প্রমাণ সাপেক্ষে দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করা যাবে। এ ছাড়া বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করবে পুলিশ।
সময়ের আলো/কেএইচও