নাটোরের ইউনুস আলীর বয়স এখন ২৮ বছর। চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তার দুই পা বিকল, চোখ দুটিও অন্ধ। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার এগিয়ে চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি আজ একজন সফল উদ্যোক্তা। তরুণ এই উদ্যোক্তা প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। সঠিক সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং সহযোগিতা পেলে তারাও মেধা আর দক্ষতা দিয়ে দেশ ও জাতির সম্পদে পরিণত হতে পারেন।
সমাজে তাদের অবহেলা না করে মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করলে তারাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন দেশের অর্থনীতিতে। কোয়েল পাখি বিক্রি করে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে ফেলেছেন তিনি। আজ তিনি স্বাবলম্বী। ক্রেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে পাখি জবাই থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, এমনকি ক্রেতার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন সবই নিজ হাতে করতে হয় তাকে।
বহুবার মানুষের ঠকবাজির শিকার হয়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। ভিক্ষা করেননি, অন্যের কাছে হাত পাতেননি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একাই সংসারের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন তিনি। তার আয়েই চলে পরিবারের যাবতীয় খরচ। নাটোর শহরতলির রথবাড়ী রাজাপুর মহল্লায় মা-বোনসহ চার সদ্যসের সংসার ইউনুস আলীর। তার বাবা আবুল কালাম আজাদ দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদাভাবে বসবাস করেন। তাদের খোঁজ-খবর রাখেন না।
একটা সময়ে ইউনুসের মা রাজিয়া বেগম তার তিন কন্যা ও দুই ছেলেকে নিয়ে শহরের ঝাউতলা বস্তিতে থেকে বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবনযাপন করেছেন। ইউনুস আলী জন্মগতভাবে স্বাভাবিক হলেও মাত্র আট বছর বয়সে স্থানীয় শের-ই-বাংলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পেটের ব্যথা ও বমি নিয়ে শহরের মাদরাসা মোড়ে এক চিকিৎসকের কাছে যান। সেই চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় আজ তিনি প্রতিবন্ধী। দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও বৃদ্ধ মা, বোনসহ চার সদ্যসের সংসারে হাল ধরতে হয়েছে তাকে। প্রতিবন্ধী ভাতার মাত্র ১৫শ টাকায় ৮০টি কোয়েল পাখি দিয়ে প্রায় ৮ বছর আগে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ইউনুস। আজ তিনি হয়েছেন ইউনুস কোয়েল ফার্মের মালিক।
জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই ইউনুসের। তার কথায়, আমি এখানে ৭-৮ বছর ধরে কোয়েল পাখির ব্যবসা করি। প্রথমে ৮০টি পাখি দিয়ে এ ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে এক থেকে দেড় হাজার পাখি আছে আমার। এই কাজে আমার মা ও বোন অনেক সহযোগিতা করে। ইউনুস আরও বলেন, সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি সহযোগিতার কোনো সুযোগ থাকলে ভালো হতো। ব্যবসায় ভালো লাভ করি। তবে অনেকে আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। তারা আমার হাতে ছেঁড়া-ফাটা টাকা ধরিয়ে দেয়। আবার অনেকে কম টাকা দিয়ে বেশি টাকা দিয়েছে বলে দাবি করে। এসব কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। শিগগির নতুন সংসারজীবন শুরু করবেন ইউনুস। এ জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি।
নাটোর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা পিয়ারুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় ৮ হাজার ২৪৪ জন প্রতিবন্ধী আছেন। তাদের সবার মতো ইউনুস আলীও প্রতিবন্ধী ভাতা পান। প্রতিবন্ধী হয়েও ইউনুস পরিশ্রম করে সংসার চালান। এটি খুবই প্রশংসনীয়। তাকে আমরা প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড দিয়েছি। সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি সহযোগিতার যেকোনো সুযোগ থাকলে দেওয়া হবে; যাতে তার পরিবার আরও স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে।
ইউনুসের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ছাওয়ালের বাবা দ্বিতীয় বিয়া করছে। অন্যখানে আলাদা সংসারে থাকে। ঝাউতলা বস্তিতে পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়া অনেক কষ্ট করছি। মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করছি। আজ ছেলে পাখির ব্যবসা করে সুখের মুখ দেখাইছে। জায়গা কিনা ঘরও করছি আমরা।
ইউনুসের বোন বলেন, ভাইয়া তো প্রতিবন্ধী। তার কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। তাই সব ধরনের কাজে আমি তাকে সাহায্য করি। পাখির খাবার দেওয়া, বাজারে তুলে দেওয়া, বাজার থেকে আসলে নামানোসহ বিভিন্ন কাজ করে দিই। ভাইয়া শুধু বিক্রি করে। মাও তাকে কাজে সাহায্য করে। অনেক সময় মা নিজেই অন্য জায়গা থেকে পাখি কিনে আনে।পুঁজি বেশি থাকলে ব্যবসা আরও বাড়ত। তারপরও বলব, ওপর আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা ভালো আছি।
শহরের নীচা বাজারের তরকারি বিক্রেতা আলাল মিয়া বলেন, নাটোর শহরের নীচা বাজার মাছ বাজারে প্রবেশপথে ও তেবারিয়া হাটে মাছ বাজারে ইউনুস আলীর কোয়েল পাখির ব্যবসা। তার অস্থায়ী দোকান, বেচা-বিক্রির জন্য নেই ভালো পরিবেশ। সরকারি বা বেসরকারিভাবে ব্যবসার জন্য তাকে স্থায়ী একটা দোকান করে দিলে তার অনেক উপকার হবে।
কোয়েল পাখির ক্রেতা ওমর আলী বলেন, অন্য কারও কাছ থেকে না কিনে ইউনুসের কাছ থেকেই আমি নিয়মিত কোয়েল পাখি কিনি। অন্যরা যে সুবিধা দেয় সেই সুবিধা আমি এখানে পাচ্ছি। জবাই ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাসহ সবই যেহেতু করে দেয় তাই এখানেই আসি। এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে সহায়তা করা হয়।
সময়ের আলো/কেএইচও