বা দিক থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা, বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নুরুল ইসলামআসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি ঢাকা-১। দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ নিয়ে গঠিত এই আসন বরাবরই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ভোটারদের জন্য পরিচিত। গ্রাম থেকে বাজার, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক আড্ডা, সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা কে হচ্ছেন আগামী দিনের প্রতিনিধি।
শিক্ষিত ভোটার, প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং দ্রুত নগরায়ণের প্রভাব এই আসনের ভোটের সমীকরণকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করে তুলেছে। এই আসনটিতে মোট পুরুষ ভোটার ২৭২৬৭৪ জন, নারী ভোটার ২৬৬৮৯৭ জন, এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন।
এর মধ্যে নবাবগঞ্জ উপজেলায় পুরুষ ভোটার ১৫৯৪৭৩ জন, নারী ভোটার ১৫৭৮১১ জন। অপরদিকে দোহার উপজেলায় পুরুষ ভোটার ১১৩২০১ জন এবং নারী ভোটার ১০৯০৮৬ জন। দুই উপজেলায় মোট ভোটার ৫৩৯৫৭৫ জন।
এবারের নির্বাচনি লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মতো দুটি প্রধান দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও ইসলামি ধারার প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি আসনটিকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
বিএনপি নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা বলছে, জামায়াত নীরব ভোটের হিসাব কষছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদা ভিন্ন বার্তা নিয়ে ভোটারের দ্বারে দ্বারে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নুরুল ইসলামও নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভোটের আগেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক গুরুত্ব : ঢাকা-১ শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যারোমিটার হিসেবেও পরিচিত। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত মিলেছে এখানকার ফলাফলে।
দোহার-নবাবগঞ্জে সড়ক, যোগাযোগ, নদীভাঙন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পায়ন দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়। ফলে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও ভোটের বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।
বিএনপির আত্মবিশ্বাস ও সংগঠনের জোর : ঢাকা-১ আসনে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে এবার দৃশ্যমান এক ধরনের আত্মবিশ্বাস লক্ষ করা যাচ্ছে। বিগত দিনে এই আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত কর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়েছে, নিয়মিত পথসভা, উঠান বৈঠক এবং গণসংযোগ চলছে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি, নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক দুবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তিনি বিভিন্ন সভায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তিনি ভোটারদের কাছে গিয়ে বলছেন, নির্বাচিত হলে অবহেলিত জনপদকে নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা রয়েছে। আর সেই প্রত্যাশা বিএনপির পক্ষে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়লে ফল আরও অনুকূলে আসবে বলে তারা মনে করেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সাংগঠনিক শক্তি নয়, ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনাও বড় ভূমিকা রাখবে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এবার সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
নীরব ভোটের হিসাব কষছে জামায়াত : যদিও এর আগে এই আসনটিতে জামায়াতের কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী ছিল না। এবারই প্রথম জামায়াতের একজন হেভিওয়েট প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এবার এ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি প্রয়াত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর মেয়ের জামাতা। সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকাশ্যে বড় সমাবেশ কম হলেও দলটি নীরবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
জামায়াত নেতারা বলছেন, অনেক ভোটার প্রকাশ্যে মত দেন না, কিন্তু ভোটের সময় তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তাই তারা নীরব ভোট বা সাইলেন্ট ভোটারের ওপর ভরসা রাখছেন। এ ছাড়া মসজিদভিত্তিক যোগাযোগ, সামাজিক কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা ভোটের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। দলের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন, পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সুশাসনের কথা তুলে ধরছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদা : নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদা। তার বাবা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ইমেজ কাজে লাগিয়ে প্রচার করছেন। তিনি তার বাবার উন্নয়নের ছোঁয়ার ধারাবাহিকতা রাখতে চান। তিনি প্রচারে জোর দিচ্ছেন সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় উন্নয়নের ওপর। তার মতে, দলীয় দ্বন্দ্বের বাইরে থেকে মানুষের কথা বলাই তার লক্ষ্য। বিএনপির ভোটে তার প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
জামায়াতের ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারেন চরমোনাই পীর : মাঠ ছাড়েননি চরমোনাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা নুরুল ইসলাম। নিয়মিত গণসংযোগ করে যাচ্ছেন তিনি। দলটির প্রতীক ও আদর্শকে সামনে রেখে তিনি ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন এবং নৈতিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন।
চরমোনাই ঘরানার ভোটারদের পাশাপাশি সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সমর্থন পাওয়ার আশায় রয়েছেন তিনি। ছোট ছোট পথসভা, বাজারে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং স্থানীয় ইস্যুতে বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন তিনি। যদিও বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়, তবু ধারাবাহিক উপস্থিতি অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারে।
ভোটারদের প্রত্যাশা : ঢাকা-১ আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। আর তা হলো তারা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না, বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। ঢাকার এত কাছে হওয়ায় এখনও এই আসনে গ্যাস আসেনি। অনেকেই বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু কেউ রক্ষা করেননি। এ ছাড়া নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত হাসপাতাল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিল্প-কারখানা স্থাপন এই আসনের ভোটারদের প্রধান দাবি।
একজন প্রবীণ ভোটার বলেন, নির্বাচনের আগে সবাই আসে, কিন্তু পরে অনেককে আর পাওয়া যায় না। এবার আমরা এমন কাউকে চাই যিনি সবসময় পাশে থাকবেন। অন্যদিকে তরুণদের দাবি কর্মসংস্থান। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে কাজের জন্য ঢাকায় বা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে চাকরির সুযোগ তৈরি হলে এলাকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা মনে করেন। এ ছাড়া এই এলাকায় মাস্টার্স ডিগ্রি বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই, এই সমাধানও চাচ্ছেন শিক্ষিত ভোটাররা।
প্রবাসী ভোটারদের প্রভাব : দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলে প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এবার তারা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। সেই সঙ্গে তাদের পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রার্থীরা তাই প্রবাসী পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। অনেকে অনলাইন সভা করছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে প্রবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণত উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার দিকে ঝুঁকে থাকে যা ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
শান্তিপূর্ণ ভোট নিয়ে প্রত্যাশা : নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের প্রত্যাশা বাড়ছে। ভোটাররা চান, তারা যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু বিজয়ী নির্ধারণ করে না, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়ায়।
শেষ মুহূর্তের প্রচার ও সম্ভাবনার অঙ্ক : নির্বাচনের দিন যত কাছে আসছে প্রার্থীদের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে গণসংযোগ। ব্যানার, মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব জায়গাতেই নির্বাচনি বার্তা। এই আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হলেও দীর্ঘ ১৫ বছর রাজত্ব করেছে আওয়ামী লীগ। তাই এককভাবে কারও জয় নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বিএনপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও নীরব ভোট বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
সব মিলিয়ে ঢাকা-১ এখন অপেক্ষা করছে ভোটের দিনের জন্য। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে, সেই চূড়ান্ত উত্তর মিলবে ব্যালটের বাক্স খুললেই। একদিকে অভিজ্ঞ রাজনীতি, অন্যদিকে নতুন মুখের প্রত্যাশা, কোথাও নীরব সমর্থন, কোথাও দৃশ্যমান জনসংযোগ। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার এই চিত্রই প্রমাণ করে ঢাকা-১ শুধু একটি আসন নয়, এটি মানুষের আশা-প্রত্যাশা আর ভবিষ্যতের প্রতীক।
সময়ের আলো/এআর